গুমের মামলায় অভিযোগ গঠন সংক্রান্ত শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে ‘ধমক’ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ সময় বিচারকক্ষে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ট্রাইব্যুনালে ধমক খেয়ে তাজুল ইসলাম গোমড়া মুখে কিছুক্ষণ বসে থাকেন।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ মঙ্গলবার এ ঘটনা ঘটে।
টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুমের ঘটনায় বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত।
এরপর সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষে আইনজীবী তাবারক হোসেন বলেন, ‘প্রসিকিউশন বিশাল আকারের ডকুমেন্ট দাখিল করেছে। এগুলো পড়ে প্রস্তুতি নিতে সময় লাগবে। অভিযোগ গঠনের বিরুদ্ধে আমরা রিভিউ আবেদন করব। তা ছাড়া আমি অসুস্থ, চিকিৎসা করা দরকার। আমাদের তিন মাস সময় প্রয়োজন।’
এ সময় ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ সদস্য বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ বলেন, ‘প্রয়োজন হলে আমরা সময় দেব।’
এ সময় প্রসিকিউশনের বক্তব্য না শুনে সময় দেওয়ার ব্যাপারে আদালতের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আপত্তি জানান চিফ প্রসিকিউটর। তিনি বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য না শুনে সময় দেওয়া ঠিক হবে না।’
এ সময় বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ বলেন, ‘লার্নেড চিফ প্রসিকিউটর, আপনি কথায় কথায় দাঁড়িয়ে যাবেন না। আপনার কথায় আমাদের চলতে হবে? আপনি আমাদের হ্যান্ডিক্যাপ বানিয়ে রাখবেন? আপনি বসেন।’
আদালতে উপস্থিত একাধিক আইনজীবী টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, এ সময় বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ স্বাভাবিকের চেয়ে উত্তেজিতভাবে কথা বলেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আপনি মতামত দিলে আসামিপক্ষ সুবিধা নেবে, আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব; এটা ন্যায়বিচার না।’
ট্রাইব্যুনালের দ্বিতীয় জ্যেষ্ঠ সদস্য বলেন, ‘আপনি কথায় কথায় দাঁড়িয়ে যান, এটা করবেন না। আসামিপক্ষকে সময় দিতে হবে। আমরা কি বলেছি সময় দেব? আমরা আলোচনা করছি। সিদ্ধান্ত তো দিইনি। আমরা কি কথা বলতে পারব না?’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘কথা বলবেন, কিন্তু আমাদের বক্তব্য না শুনে আপনাদের আলোচনায় সিদ্ধান্ত দিলে গ্রাউন্ড তৈরি হয়।’
তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন একটি বিশেষ আইন। অপরাধের গুরুত্বের কারণে বিলম্ব ছাড়া এ মামলার বিচার করতে বলা হয়েছে। বিলম্ব ছাড়া, স্বল্প সময়ের মধ্যে বিচার নিষ্পত্তি করাই আইনটির উদ্দেশ্য। এখানে অভিযোগ গঠনের পরে আসামিপক্ষকে ন্যূনতম তিন সপ্তাহ সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ মামলায় অভিযোগ গঠনের আগেই আসামিপক্ষ চার সপ্তাহ সময় পেয়েছে। এখন আইনে অনুমোদিত তিন সপ্তাহের বেশি অতিরিক্ত সময় দেওয়ার সুযোগ নেই। তিন সপ্তাহের বেশি সময় দিলে ন্যায়বিচার হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আসামিপক্ষের আইনজীবী অসুস্থ থাকলে তিনি মামলা ছেড়ে দেবেন। তিনি ফিট না হলে মামলা নিয়েছেন কেন? তার জন্য তো আদালত বসে থাকবে না। তিনি সাতজন আসামির হয়ে মামলা লড়ছেন, সাতজনের জন্য কি আলাদাভাবে সময় দিতে হবে? একই ঘটনা, একই অভিযোগ; একজনের ব্যাপারে প্রস্তুতি নিলে বাকিদের বিষয়েও প্রস্তুতি নেওয়া হয়ে যায়। মূলত আসামিপক্ষ মামলা দীর্ঘায়িত করতে চায়। সাক্ষীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ছুরিকাঘাত করা হচ্ছে। সাক্ষীদের মেরে ফেললে আমরা বিচার করব কীভাবে?’
আদালতের বাইরে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের প্রদত্ত বক্তব্যের প্রসঙ্গে চিফ প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালে বলেন, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বাইরে গিয়ে বলেন, ‘সেনা কর্মকর্তাদের বিচার করা হচ্ছে।’
এর মাধ্যমে হাইপ তুলে সেনাবাহিনীকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এই আসামিরা ঘটনার সময় র্যাবে ছিলেন, সেই সময়কার অপরাধের বিচার হচ্ছে। তারা সেনাবাহিনীতে থাকা অবস্থায়, আর্মির পোশাকে এই অপরাধ করেননি।
এ সময় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা আর্মির বিরুদ্ধে না, এখানে আর্মির বিচার হচ্ছে না।’
তাজুল বলেন, ‘আমার সাক্ষীদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। গুম করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। সাক্ষী না থাকলে মামলা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’ পরে ২১ জানুয়ারি প্রসিকিউশনের উদ্বোধনী বক্তব্যের দিন ধার্য করা হয়েছে।


