সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বহু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে খেয়ালখুশিমতো শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।
সংস্থাটি বলেছে, শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়া কিংবা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে সুরক্ষিত মতপ্রকাশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘন করবে। একই সঙ্গে এর মাধ্যমে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক মতামত ও মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণে আগের সরকারগুলোর দমনমূলক প্রচেষ্টারই পুনরাবৃত্তি হবে।
এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রাজনৈতিক বিতর্কের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। এ ধরনের আলোচনা নিয়ে শুধু স্বৈরশাসকদের ভয় পাওয়ার কথা, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর গঠিত কোনো সরকারের নয়। ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে পালাবদল হলেই অতীতের দমনপীড়নের পুনরাবৃত্তি না করে বাংলাদেশের উচিত সেই অধ্যায় পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়া।’
এইচআরডব্লিউর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষকদের চাকরিচ্যুত করা, সাময়িক বরখাস্ত করা এবং পাঠদানে বিধিনিষেধ আরোপের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পেছনে কিছু অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আছে ২০২৪ সালে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকারের সহিংসতায় শিক্ষকদের জড়িত থাকার অভিযোগ, দলটির পক্ষে অন্যান্য ‘ধ্বংসাত্মক’ কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকার অভিযোগ এবং ইসলামি পোশাক পরা শিক্ষার্থীদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগ। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের সদস্য ও সমর্থক বলে অভিযোগ তুলে শত শত শিক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। এতে তারা শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক ডজনের বেশি ভুক্তভোগী শিক্ষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠিপত্র, টেলিভিশনে প্রচারিত একটি আলোচনা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করেছে সংস্থাটি। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকারে বহিষ্কার, পরীক্ষার সনদ বাতিল এবং শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
আগস্টে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২২টি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৪০৪ জন শিক্ষককে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। তারা আওয়ামী লীগপন্থী একটি টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্য ছিলেন।
নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক বলেন, ‘এখন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মিথ্যা অভিযোগ তুলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং ২০২৪ সালের শিক্ষার্থী আন্দোলনে সমর্থন না দেওয়া শিক্ষকদের লক্ষ্যবস্তু করছে। আমাদের ক্লাস নিতে দেওয়া হচ্ছে না, গবেষণার কাজ করতে পারছি না, কিছুই করতে পারছি না।’
২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে আন্দোলন দমনে পুলিশের নৃশংস দমনপীড়নে শত শত মানুষ নিহত হন। এর ফলে হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। পরবর্তী সময়ে গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় ফেরে। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে।
বহু বছর ধরে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দলীয় প্রভাবের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়ে আসছে। ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়োগ ও পদোন্নতি দেওয়া এবং অন্য রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসন ৪৪ জন শিক্ষককে সব ধরনের কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। আরও ২৫ জনের পাঠদানের দায়িত্ব সীমিত করা হয়। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছ বা বিশ্বাসযোগ্য কোনো শৃঙ্খলামূলক তদন্ত করা হয়নি। পরে একটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ছয় শিক্ষককে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সাময়িক বরখাস্ত’ করা হয়। আরও ১৪ শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই ধরনের তদন্ত শুরু হয়েছে।
ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তদন্ত কমিশন’ গঠনের পর ১২ জন শিক্ষককে চাকরিচ্যুত, সাময়িক বরখাস্ত বা দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। আরও ৩৪ জনের পদাবনতি করা হয় অথবা তাদের কার্যক্রম সীমিত করা হয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুযায়ী নির্ধারিত শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে বলে মনে হয়নি।
ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তদন্তের পর ১২ জন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত এবং আরও ১০ জনকে একাডেমিক কার্যক্রম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষকদের অভিযোগ, তদন্ত প্রক্রিয়ায় তাদের অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এটি একাডেমিক শৃঙ্খলা সংক্রান্ত আইন লঙ্ঘনের শামিল বলে মনে হচ্ছে। এ ছাড়া আরও ৮৫ জন শিক্ষককে পদোন্নতি দেওয়া হয়নি।
এইচআরডব্লিউর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সব মিলিয়ে ২০টির বেশি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে।
২০২৫ সালের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি তথ্য অনুসন্ধান কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১২৬ শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করে এবং তাদের পরীক্ষার সনদ আটকে দেয়। কমিটির দাবি, এসব শিক্ষার্থী শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করেছিলেন। এ বিষয়ে ছবি, ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত প্রমাণও পাওয়া গেছে।
পুলিশের কাছে করা মামলায় আওয়ামী লীগের আরও ২৭৭ জন শিক্ষার্থীর জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, আটকের ভয়ে তারা ক্যাম্পাসে আসছেন না। যাদের নাম অভিযোগে এসেছে, তাদের অনেকে সহিংসতায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু অভিযোগের জবাব দেওয়ার কোনো সুযোগ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের দেয়নি।
শাস্তির মুখে পড়া শিক্ষকদের একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মশিউর রহমান। ২০১৭ সাল থেকে তিনি অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর তাকে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোর একটি হলো, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে একটি টেলিভিশন আলোচনায় তিনি আন্দোলনকে অবৈধ, ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে সরাসরি বিরোধিতা করেছিলেন। তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ওই অনুষ্ঠানের যে ভিডিও পর্যালোচনা করেছে, তাতে এ ধরনের কোনো মন্তব্য দেখা যায়নি।
আরেকটি অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে তিনি ‘গণহত্যায় উসকানি’ দিয়েছিলেন। তবে ওই বৈঠকটি আয়োজন করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং সব উপাচার্যকে এতে উপস্থিত থাকতে হয়েছিল। মশিউর রহমান হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে জানিয়েছেন, তিনি এ ধরনের কোনো বক্তব্য দিয়েছিলেন, এমন প্রমাণ তাকে দেওয়া হয়নি। তিনি অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন।
২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার সুপারিশ করে। এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি আপিল করেছেন।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মূল বিষয় ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগপন্থী একটি মিছিলে অংশ নেওয়া। হাসিনা দেশ ছাড়ার এক দিন আগে ওই মিছিল হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের গঠিত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে মিছিলটিকে ‘সন্ত্রাসী’ মিছিল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির ফেসবুক পেজে মিছিলটির একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভিডিওটি বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা যায়, একদল মানুষ স্লোগান দিতে দিতে ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। তবে সরাসরি কোনো সংঘর্ষের দৃশ্য দেখা যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক পূর্বা ইসলামকে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। মিছিলে স্লোগান দেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে ‘হাসিনার নিপীড়ন, নির্যাতন ও গণহত্যার প্রতি সমর্থন’ জানানোর অভিযোগ আনা হয়। তবে ভিডিওতে তাকে স্লোগান দিতে দেখা যায়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যানিমেল ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ইয়াহিয়া খন্দকারকেও ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে তিনি ‘হাসিনার গণহত্যার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান’ নিয়েছিলেন। তবে ইয়াহিয়া খন্দকার জানিয়েছেন, আন্দোলনের পুরো সময় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন না, পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় ছিলেন। হাইকোর্ট তার সাময়িক বরখাস্তের আদেশ স্থগিত করেছেন। তবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তিন শিক্ষককে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। তাদের দুইজন কারাগারে রয়েছেন। আরেকজনের বিরুদ্ধে বিচার চলছে।
মীনাক্ষী গাঙ্গুলি বলেন, ‘আগের সরকারকে শান্তিপূর্ণভাবে সমর্থন করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে তা প্রমাণ করবে যে মতপ্রকাশ ও সমাবেশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত নয়। বিশ্ববিদ্যালয় হওয়া উচিত এমন জায়গা, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে নিজেদের মতপ্রকাশ করতে পারবেন।’


