উদ্বোধনের দিন ঘনিয়ে আসছে, সচল হবে তো থার্ড টার্মিনাল?

উদ্বোধনের দিন ঘনিয়ে আসছে, সচল হবে তো থার্ড টার্মিনাল?
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল। ফাইল ছবি
Advertisement
Advertisement

বিজয় দিবসে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের উদ্বোধনের ঘোষণা থাকলেও টার্মিনাল পরিচালনা কারা করবে, সেই প্রশ্নেরই জবাব পাওয়া যাচ্ছে না।

এখনো টার্মিনালের ব্যবস্থাপনায় থাকবে যারা, সেই জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনা শেষ হয়নি। প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব কে পাবে, এসব এখনো ঠিক হয়নি।

আবার ইমিগ্রেশন পুলিশ, কাস্টমসহ বিমানবন্দরে গুরুত্বপূর্ণ বহু সংস্থা কাজ করে থাকে। এখনো এসব সংস্থার প্রস্তুতি চোখে পড়েনি।

এতগুলো কাজ বাকি থাকলেও বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বারবার আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনালটি উদ্বোধনের কথা প্রচার করছেন।

বিমানবন্দরের মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষও (বেবিচক) একই কথা বলছে। তারা উদ্বোধনী দিনে ১০টি ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তাবও করেছে। আর জাপানি কনসোর্টিয়াম চারটি ফ্লাইট পরিচালনার বিষয়ে রাজি হয়েছে।

বেবিচকের সাবেক চেয়ারম্যান মফিদুর রহমান জানান, সীমিত পরিসরে থার্ড টার্মিনাল চালুর পরিকল্পনা করছে বলে তিনি শুনেছেন। তবে এটি কতটা কার্যকর হবে তা নিয়ে তার সন্দেহ রয়েছে।

টাইমসকে তিনি বলেন, ‘পদ্ধতিগতভাবে চিন্তা করলে ঘোষিত সময়ে টার্মিনাল চালু করা সম্ভব নয়। কারণ, এখনো দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনাই শেষ হয়নি। এরপর চুক্তি করে জনবল নিয়োগ করে তা চালু করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।’

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব কে পাবে–এই জিজ্ঞাসার মধ্যে চারটি কোম্পানিকে শর্টলিস্টেড করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে দিয়েই গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের কাজ করানো হবে। তবে বিমানকে এই দায়িত্ব দিলে আসলে উন্নত সেবা পাওয়া যাবে কি না, সে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বর্তমানে দুটি টার্মিনালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে বিমানের ব্যর্থতার বিষয়টি বারবার আলোচনায় আসছে।

বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক টাইমসকে বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট দিনেই তৃতীয় টার্মিনাল চালু হবে, সে লক্ষ্যেই সব ধরনের প্রস্তুতি চলছে। জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনাও দ্রুত শেষ হবে।’

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দ্রুততম সময়ে একটি কোম্পানি নিয়োগ পাবে।’

বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িতরা বলছেন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য চুক্তি করাই শেষ কথা নয়। চুক্তির পর কোম্পানিকে যন্ত্রপাতি আনতে হবে। সেজন্য ৯ মাস লিড টাইম আছে। তবে নির্ধারিত সময়ে বাংলাদেশে কাজ শেষ হয় না বললেই চলে, সে ক্ষেত্রে সেটি এক বছরও পেরিয়ে যেতে পারে।

সরকারের সঙ্গে সমঝোতা অনুযায়ী জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি লিমিটেড, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোই ও নারিতা ইন্টারন্যাশনাল করপোরেশনকে নিয়ে তৈরি জাপানি কনসোর্টিয়াম ১৫ বছরের জন্য তৃতীয় টার্মিনালের অপারেশন ও ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব পালন করার কথা। তবে কী কী শর্ত থাকবে এবং রাজস্ব ভাগাভাগিতে কার অংশ কতটুকু থাকবে, সেসব নিয়েই আলোচনা এখনো শেষ করা যায়নি।

বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তার ধারণা, জাপানি কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে আলোচনা করে সব প্রক্রিয়া শেষ করতে আরও সময় লাগবে। চুক্তি হওয়ার পরে তা আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং, অর্থ মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ে কেবিনেট কমিটিরও অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।

২০২৫ সালে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-১ ও টার্মিনাল-২ এক কোটি ২৭ লাখ ২০ হাজার যাত্রী হ্যান্ডলিং করেছে। এর মধ্যে এক কোটি ৩ লাখ ১২ হাজার ছিল আন্তর্জাতিক রুটের। অথচ এই বিমানবন্দরের ৮০ লাখ যাত্রী হ্যান্ডেলিং করার সক্ষমতা রয়েছে।

আরও পড়ুন

সক্ষমতার চেয়ে বেশি সংখ্যক বেশি যাত্রী বিমানবন্দর ব্যবহারের ফলে যাত্রীদের যেমন ভোগান্তি হচ্ছে, তেমনি নানা অব্যবস্থাপনাও হচ্ছে। বর্তমানে চালু দুটি টার্মিনালের আয়তন এক লাখ বর্গমিটার। চালু হতে যাওয়া তৃতীয় টার্মিনালের আয়তন এই দুটির সম্মিলিত আয়তনের দ্বিগুণেরও বেশি, দুই লাখ ৩০ হাজার বর্গমিটার।

গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে আলোচনায় তুরস্কের কোম্পানি

বেবিচকের সূত্র বলছে, যে চারটি কোম্পানিকে শর্টলিস্টেড করা হয়েছে, সেগুলো হলো: সুইজারল্যান্ডের সুইসপোর্ট, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডানাটা, যুক্তরাজ্যের মেনজিজ এভিয়েশন ও তুরস্কের চেলেবি এভিয়েশন।

এর মধ্যে চেলেবির নামটি বেশ চমক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তারা কাজ পেতে ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছে। তারা এরই মধ্যে গণসংযোগের দায়িত্বে বেসরকারি এজেন্সি বেঞ্চমার্ককে ভাড়া করেছে। সেই কোম্পানির কর্ণধার আশরাফ কায়সার একজন সাবেক সংবাদকর্মী। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে তার নাম ব্যাপকভাবে আলোচিত। সরকারের উচ্চ পর্যায়ে তার যোগাযোগ থাকার আলোচনা আছে।

বিমান চলাচল খাতে বাংলাদেশে প্রভাবশালী একটি কোম্পানির সঙ্গেও অংশীদারত্বের চুক্তি করেছে চেলেবি। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টাও তাদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বর্তমান মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের ছেলেও তাদের সঙ্গে আছেন।

বিমানের সাবেক একজন শীর্ষ কর্মকর্তা টাইমসকে নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার থাকার সময়ই চেলেবি তৎপর ছিল, তৎপর ছিল ব্রিটিশ কোম্পানিও। নিজ নিজ দেশের কোম্পানির জন্য ওইসব দেশের দূতাবাসের দূতিয়ালি ছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টাও বিমানের বোর্ড সভায় চেলেবির পক্ষে কথা বলেছেন, তাদের কাজের প্রশংসা করেছেন।

সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন বিমানে শ্রমিক দলের বিগত কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির। তিনি টাইমসকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে হঠাৎ করে একদিন বিমান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন অফিসে এসে তুরস্কের কোম্পানির পক্ষে কথা বলেন। আমি তখন এর বিরোধিতা করে বলি, “আপনি এই কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত। তাই বিমানের কাছ থেকে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং অন্য কোম্পানিকে দিতে এই কাজ করছেন”।’

তবে সাবেক উপদেষ্টা ও বেসরকারি কোম্পানি আকিজ বশির গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বশির টাইমসের প্রশ্নে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, ‘আমি এই ধরনের কোনো বক্তব্য দিইনি।’

টাইমসের প্রশ্নে চেলেবি এভিয়েশনের গ্রুপ সিইও ডেভ ডরনারের বক্তব্য পাঠিয়েছে বেঞ্চমার্ক। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে কেন তারা নিজেদেরকে যোগ্য মনে করছে–এই প্রশ্নে তিনি দাবি করেন, উদীয়মান বাজারে তাদের কাজের অভিজ্ঞতা ও সাফল্যের রেকর্ড রয়েছে। তারা এখন তিনটি মহাদেশের ৬০টির বেশি স্টেশনে কার্যক্রম পরিচালনা করছে ও ৪০০টির বেশি এয়ারলাইন্সকে সেবা দিচ্ছে। বাংলাদেশে তাদের অংশীদারের নাম জানতে চাওয়া হলে সেটি জানাতে রাজি হননি ডরনার।

তৃতীয় টার্মিনালের দায়িত্ব পেলে ১৬ ডিসেম্বরের আগে কাজ শুরু করতে পারবে কি না–এই প্রশ্নে তিনি চেলেবির জবাব ছিল এমন: ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তারা ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা ও বালি বিমানবন্দরে প্রবেশাধিকার পেয়েছিল। আর ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রথম ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করেছে।

শর্টলিস্টে থাকা আরেক কোম্পানি আরব আমিরাতের ডানাটার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। এখন তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বিএনপি সরকারের আরেক মন্ত্রীর ছেলে।

ব্রিটিশ কোম্পানি মেনজিজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন প্রভাবশালী একটি পরিবারের সদস্য। সুইসপোর্টের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাবেক এক পরিচালক।

কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং খাতে ১২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ইঙ্গিত দিয়েছে চেলেবি। তারা বলছে, এতে দেড় হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। মেনজিজের পক্ষ থেকেও সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ ও এক হাজার লোকের কর্মসংস্থানের কথা বলা হয়েছে।

শাহজালাল বিমানবন্দরের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। এই খাত থেকে বিমান বছরে দেড় হাজার কোটি টাকা আয় করে থাকে, যা বিমানের মোট আয়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় উৎস। আশা করা হচ্ছে, তৃতীয় টার্মিনালে তিন হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব।

বড় অঙ্কের আয় হওয়ায় খাতটির ওপর দীর্ঘদিন ধরে বিদেশিদের নজর ছিল। বিভিন্ন সরকারের সময়ে বিদেশি কোম্পানিগুলো এদেশীয় ব্যবসায়িক অংশীদারের মাধ্যমে ব্যবসা পেতে জোর চেষ্টা করেছে।

তবে বিমানের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। সময়মতো লাগেজ না পাওয়া, লাগেজ চুরি, সুটকেস ভেঙে যাওয়ার মতো বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ রয়েছে।

বিমান চলাচল বিশেষজ্ঞ এটিএম নজরুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, ‘বিমান যদি তৃতীয় টার্মিনালের কাজ না পায় তাহলে একটি বড় ব্যবসা হারাবে। এটি দেশের জন্য বা বিমানের জন্য ভালো হবে না। তবে বিমানকে সেবার মান বাড়াতে হবে।’

বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেন, ‘তৃতীয় টার্মিনালে সুপরিসর জায়গা ও ভালো পরিবেশ পাবে যাত্রীরা। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান বিমানবন্দরের সেবায় নিয়োজিত থাকবে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে, একই সঙ্গে বাড়াতে হবে সেবার মান।’

আওয়ামী লীগ সরকারে থাকার সময় যেসব মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল, তার মধ্যে একটি এই থার্ড টার্মিনাল। ২০১৬ সালে যখন প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়েছিল, তখন এর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা। তবে তৃতীয় সংশোধনী অনুযায়ী প্রকল্পটির মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার ২১৩ কোটি ৯ লাখ ৬৪ হাজার টাকা।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় শেখ হাসিনা এই টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধন করেছিলেন। তখন জানানো হয়েছিল, ২০২৪ সালের শেষের দিকে যাত্রীরা এটি ব্যবহার করতে পারবে।

তবে ২০২৪ সালের আগস্টের গণঅভ্যুত্থান অন্যান্য অনেক প্রকল্পের মতো এই প্রকল্পের কাজের গতিও কমিয়ে দেয়। পরবর্তী সময়ে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন কাজ বাকি থাকায় বেবিচক ২০২৫ সালের জুন-জুলাই মাসের মধ্যে এটি চালুর সম্ভাব্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল।

এই প্রকল্পে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে। টার্মিনাল চালু না হলেও জাপানি ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হয়ে গেছে। বেবিচক তাদের অন্য খাতের আয় থেকে ঋণের কিস্তি বাবদ ১ হাজার ১০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে। আগামী ডিসেম্বরেও প্রায় ৯০০ কোটি টাকার কিস্তি পরিশোধের কথা রয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad