দেশের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম শিল্পের বিকাশ, আমদানি নির্ভরতা কমানো এবং রপ্তানি বাড়াতে সরকারের কার্যকর নীতি সহায়তা চেয়েছেন এ খাতের উদ্যোক্তা ও বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার স্থাপন এবং সরকারি ক্রয়ে দেশীয় পণ্যের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা গেলে এ খাতে বড় সম্ভাবনা তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রান্সফরমার্স অ্যান্ড সুইচগিয়ার্সের (বিম্যাটস) প্রথম বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) উপলক্ষে বৃহস্পতিবার রাজধানীর রেডিসন ব্লু ঢাকা ওয়াটার গার্ডেন হোটেলে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘পাওয়ার-আপ বাংলাদেশ: থ্রু ইমপোর্ট সাবস্টিটিউশন অ্যান্ড গ্রোয়িং এক্সপোর্ট উইথ ইলেকট্রিক্যাল ইকুইপমেন্ট মেইড ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এ সেমিনারের মিডিয়া স্পন্সর ছিল বাছাড় ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড।
বিম্যাটসের সভাপতি প্রকৌশলী আলী আজমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন। অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সায়েদ মো. কামরুজ্জামান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম। অনুষ্ঠানে বাছাড় ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক উজ্জ্বল কান্তি বাছাড়ও উপস্থিত ছিলেন।
সভাপতির বক্তব্যে প্রকৌশলী আলী আজম বলেন, দেশীয় শিল্পের সুরক্ষা ও ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ পণ্যের প্রসার শুধু বাণিজ্যিক বিষয় নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। যথাযথ সরকারি নীতি সহায়তা, কর কাঠামোর যৌক্তিকীকরণ এবং পণ্যের মান পরীক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রতিযোগিতায় সক্ষম হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হাসিব চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বৈদ্যুতিক ও জ্বালানি খাতে প্রবৃদ্ধির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষাগার এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে এ খাতকে রপ্তানিমুখী শিল্পে রূপান্তর করা সম্ভব।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং আন্তর্জাতিক মানের পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের অর্থ দেশেই রাখা সময়ের দাবি। মানসম্পন্ন গবেষণাগার স্থাপন, প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং সরকারি ক্রয়ে মানসম্মত দেশীয় পণ্যকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ নেবে।
সেমিনারে বিম্যাটসের সহ-সভাপতি প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আল জিলানী সংগঠনের কার্যক্রম ও সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তার বিষয়ে তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন। এতে দেশীয় ট্রান্সফরমার, সুইচগিয়ার ও বৈদ্যুতিক প্যানেল উৎপাদন এবং বাজার পরিস্থিতি তুলে ধরা হয়।
উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, দেশে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বাজারের আকার প্রায় ৪৭৫ কোটি মার্কিন ডলার। এর প্রায় ৭৫ শতাংশ পণ্যই আমদানি করা হয়। অথচ বিম্যাটসের ৩৩টি সদস্য প্রতিষ্ঠানসহ শতাধিক দেশীয় প্রতিষ্ঠান এসব পণ্য উৎপাদন করছে। সংগঠনটির কয়েকটি সদস্যপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে ভারত, নেপাল, তানজানিয়াসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে পণ্য রপ্তানি করেছে। এসব রপ্তানির মোট মূল্য ২ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বেশি।
বক্তারা জানান, বিশ্ববাজারে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের বর্তমান আকার প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার, যা আগামী ১০ বছরে ৯০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। এ বাজারের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারি ক্রয়ে দেশীয় পণ্যের মূল্য অগ্রাধিকার, কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক হ্রাস এবং জাতীয় পর্যায়ে মানসম্মত পরীক্ষাগার স্থাপন জরুরি।
তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় নীতি সহায়তা পাওয়া গেলে আগামী ১০ বছরে এ খাতে আমদানিনির্ভরতা ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। একই সময়ে বার্ষিক রপ্তানি প্রায় ৪০০ কোটি ডলারে উন্নীত এবং প্রায় ১ হাজার ৪৩০ কোটি ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা সম্ভব হতে পারে।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনের পর উন্মুক্ত প্যানেল আলোচনা ও প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে বিদ্যুৎ বিভাগ, বিপিডিবি, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), পাওয়ার সেল, বিপিপিএ, প্রধান বিদ্যুৎ পরিদর্শকের কার্যালয় এবং বিএসটিআইয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিম্যাটসের সাধারণ সম্পাদক উৎপল কুমার দাস। সমাপনী বক্তব্যে ধন্যবাদ জানান সংগঠনের সিনিয়র সহ-সভাপতি প্রকৌশলী মো. রবিউল আলম।


