জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আর নয়

জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আর নয়
ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

উচ্চশিক্ষার প্রসারের নামে লুটপাটের দীর্ঘ অধ্যায় পেছনে ফেলে যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার অপরিকল্পিত ধারা থেকে অবশেষে সরে আসছে সরকার। সুশিক্ষা নিশ্চিত করার বাস্তবসম্মত কোনো রূপরেখা ছাড়াই বিগত সরকারের আমলে গড়ে ওঠা বহু প্রতিষ্ঠান আজ নামসর্বস্ব প্রকল্পমাত্র। ভূমি অধিগ্রহণ থেকে শুরু করে অবকাঠামো নির্মাণ—প্রতিটি ধাপেই একশ্রেণির প্রভাবশালী মহলের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল একেকটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ।

অথচ ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও কাগজে-কলমে থাকা এমন অনেক প্রতিষ্ঠানে আজও কোনো শিক্ষার্থীর দেখা মেলেনি। উচ্চশিক্ষার এই বিশৃঙ্খল ও সুদূরপ্রসারী ক্ষতি ডেকে আনা প্রবণতায় রাশ টানতে এখন কঠোর অবস্থানে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)।

ছয় বছর আগে ২০২০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক অনুমোদন মেলে। ২০২৩ সালে সংসদে আইন পাসের সময় এর নাম বদলে রাখা হয় ‘মুজিবনগর বিশ্ববিদ্যালয়’। এরপর ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ফের নাম পরিবর্তন করে পুরনো মেহেরপুর বিশ্ববিদ্যালয় নামে ফিরে আসে।

অনুমোদনের ৬ বছর এবং আইন পাসের ৩ বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্ববিদ্যালয়টিতে এখন পর্যন্ত কোনো শিক্ষার্থী বা শিক্ষাকার্যক্রম নেই। এই স্বল্পসময়ে নাম বদলেছে তিনবার, সর্বশেষ বিএনপি সরকারের নিয়োগ করা উপাচার্যসহ নিয়োগ পেয়েছেন তিনজন উপাচার্য।

একই দশা লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শরীয়তপুর কৃষি এবং ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের। ২০২৩ সালে আইন পাস হলেও নাম বদল ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা শুরু হয়নি।

সম্প্রতি এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কেবল ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই পড়াশোনা শুরুর তোড়জোড় চলছে। তবে বাকি তিনটির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) এখনো কোনো প্রস্তুতি নেই।

আরও পড়ুন

ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ক সদস্য অধ্যাপক আব্দুল্লাহ-আল-মামুন টাইমসকে জানান, শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আগামী শিক্ষাবর্ষে ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমতি মিলতে পারে। তবে বাকি তিনটির বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে জনতুষ্টির জন্য কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই বহু বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একটি নতুন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন পাওয়া মানেই যেন একদল মানুষের জন্য লুটপাটের মহোৎসব। জমি কেনা থেকে শুরু করে ভবন নির্মাণ—সব ক্ষেত্রেই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভাগ্য বদলানোর সুযোগ তৈরি হয়।’

এই কর্মকর্তা জানান, এবার বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও অনেক সংসদ সদস্য নিজ নিজ এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার দাবি তুলে সরব হয়েছেন।

বর্তমানে দেশে মোট ১৭৮টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে ৬১টি সরকারি এবং ১১৭টি বেসরকারি; নতুন করে আরও ১১টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন যাচাই করছে ইউজিসি।

এদিকে গত মাসে জাতীয় সংসদে ময়মনসিংহ, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নাটোর, বাগেরহাট, শেরপুর ও রাজধানীর ঢাকা-১৮ নির্বাচনী এলাকাসহ অন্তত ১০টি জেলায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি তুলেছেন সংসদ সদস্যরা।

তবে দাবির মুখে যত্রতত্র বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার নীতি থেকে সরকার সরে আসছে বলে জানিয়েছেন ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ। তিনি টাইমসকে জানান, অতীতে সম্ভাব্যতা যাচাই না করেই অনেক বিশ্ববিদ্যালয় খোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এখন মূল লক্ষ্য হলো বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মানসম্মত করে গড়ে তোলা এবং উচ্চশিক্ষায় শৃঙ্খলা আনা।

ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, এখন থেকে কোনো জেলায় নতুন বিশ্ববিদ্যালয় না খুলে প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিশেষায়িত অনুষদ, ইনস্টিটিউট বা পার্শ্ববর্তী জেলায় পৃথক ক্যাম্পাস খোলা হবে। একইভাবে নতুন মেডিকেল, কৃষি বা প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় না বানিয়ে বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেই তা চালুর কথা ভাবা হচ্ছে।

সবমিলিয়ে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় খোলার জোয়ার থামিয়ে এখন পুরনো প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার মান নিশ্চিত করাকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ইউজিসি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad