কিশোরগঞ্জ মডেল কলেজে এ বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় পাস করেছে মাত্র ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ শিক্ষার্থী। অথচ ঢাকার বিখ্যাত নটর ডেম কলেজের ৬৮ দশমিক ২ শতাংশ শিক্ষার্থীই পেয়েছে পরীক্ষার সর্বোচ্চ গ্রেড জিপিএ-৫।
গত ২২ বছরের মধ্যে দেশের এইচএসসি পরীক্ষার ফল সবচেয়ে খারাপ হওয়া সত্ত্বেও শীর্ষস্থানীয় কলেজগুলো তাদের ভালো ফলাফল ঠিকই ধরে রেখেছে। আর দেশের শিক্ষাব্যবস্থার মান এবং সুযোগ-সুবিধার গভীর পার্থক্য স্পষ্ট করে দিয়েছে এই বৈষম্য।
শহরের তুলনায় ছোট শহর ও গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা হয়েছে বেশ শোচনীয়।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষকদের মান, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা, সুযোগ-সুবিধা এবং শিক্ষার্থীদের পারিবারিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পার্থক্যের কারণেই এই ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এম ওয়াহিদুজ্জামান টাইমসকে জানান, শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিজস্ব শিক্ষণপদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনার জোরেই এই কঠিন পরিস্থিতি সামলে উঠেছে।
তিনি বলেন, ‘তারা নিজেদের শিক্ষণপদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পেরেছে।’
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য মোহাম্মদ আলী জিন্না সম্পদের ও সুযোগের অসমতার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘সব জায়গায় শিক্ষকদের মান বা সুযোগ-সুবিধা একরকম নয়। এ ছাড়া পারিবারিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার পার্থক্যের কারণে সব শিক্ষার্থী সমানভাবে প্রস্তুতিও নিতে পারেনি। এসব বিষয়ও ফলাফলে প্রভাব রেখেছে।’
যেসব কলেজ পড়াশোনার জন্য বিখ্যাত এবং যেখানে সন্তানদের পড়াতে অভিভাবকরা প্রতিযোগিতা করেন, সেগুলোতে পাসের হার ৯৪ থেকে প্রায় ১০০ শতাংশ। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
যদিও বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল দেশের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ হয়েছে, তবুও বরিশাল ক্যাডেট কলেজের ৪৬ জন পরীক্ষার্থীর সবাই জিপিএ-৫ পেয়ে পাস করেছে।
ঢাকার অন্যান্য নামী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে হলিক্রস কলেজে পাসের হার ৯৯ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং ৮১৬ জন বা মোট শিক্ষার্থীর ৬২ দশমিক ৬৭ শতাংশ জিপিএ-৫ পেয়েছে। নটর ডেম কলেজের ৩ হাজার ২৫৬ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৯৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ২ হাজার ২২৯ জন। রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে ১ হাজার ৬৩৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাসের হার ৯৯ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ৮২৯ জন বা ৫০ দশমিক ৬৭ শতাংশ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। ঢাকা রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে ৯৩২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাসের হার ৯৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ৬০৫ জন বা ৬৪ দশমিক ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। এ ছাড়া বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজে পাসের হার ৯৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং প্রায় ৪৯ দশমিক ১০ শতাংশ বা ৮৭৪ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে।
এই কলেজের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তাজুল ইসলাম ভালো ফলাফলের পেছনের রহস্য হিসেবে সুশৃঙ্খল পাঠদান ও নিয়মিত তদারকির কথা জানিয়েছেন।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানে সারা বছর খুব পরিকল্পনা ও নিয়ম মেনে পড়াশোনা হয়। প্রথম দিন থেকেই এইচএসসি পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে আমরা নির্দিষ্ট রুটিন, একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও ক্লাসের নিয়ম মেনে চলি। তাই দেশের অন্য জায়গায় ফল খারাপ হলেও আমাদের এখানে তার প্রভাব পড়ার সুযোগ নেই।’
ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে ২ হাজার ৩৭৭ জনের মধ্যে পাস করেছে ২ হাজার ২৩৮ জন বা ৯৪ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৪১৬ জন। ঢাকার বাইরে নরসিংদীর আবদুল কাদির মোল্লা সিটি কলেজে ১ হাজার ৫৫২ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজন ফেল করেছে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫৬১ জন বা ৩৬ দশমিক ১৫ শতাংশ। এ ছাড়া ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজের ৬১ জন পরীক্ষার্থীর সবাই পাস করেছে, যার মধ্যে ৪৫ জনই পেয়েছে জিপিএ-৫।
রাজনৈতিক প্রভাব এবং সুযোগের অভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আবদুস সালাম বলেন, এই ফলাফল গ্রাম ও শহরের কলেজের মধ্যকার ব্যবধান আবারও পরিষ্কার করে দিয়েছে। তিনি টাইমসকে জানান, ‘গ্রাম ও শহরের কলেজের শিক্ষক এবং সুযোগ-সুবিধার মানে আকাশ-পাতাল ফারাক রয়েছে। দেশের একটা বড় অংশের শিক্ষার্থী গ্রাম ও ছোট শহরে থাকে। কিন্তু সেখানে রাজনৈতিক বিবেচনায় কলেজ গড়ে তোলা হয়। অনেক সময় আত্মীয়স্বজন বা টাকার বিনিময়ে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়, যা শিক্ষার মান নিয়ে বড় প্রশ্ন তোলে।’
একজন সংসদ সদস্যের উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, যিনি তার এলাকায় ৩৫টি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি প্রতিষ্ঠানের এমন অপরিকল্পিত প্রসারের কঠোর সমালোচনা করেন।
আবদুস সালাম বলেন, ‘শিক্ষার মানের দিকে নজর না দিয়ে এটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হয়েছে। যার খেসারত দিতে হয় খারাপ ফলাফলের মাধ্যমে।’
পাশাপাশি, পারিবারিক আর্থিক অবস্থা এবং অভিভাবকদের সচেতনতার অভাবকেও তিনি এজন্য দায়ী করেন।
তিনি বলেন, ‘গ্রামের অভিভাবকরা অতটা সচেতন নন, তারা সন্তানদের খোঁজও রাখতে পারেন না। কিন্তু শহরের অভিভাবকরা এ বিষয়ে অনেক বেশি সচেতন।’
এই বৈষম্য দূর করতে তিনি ক্যাচমেন্ট এরিয়া বা নিজ এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ব্যবস্থার ওপর জোর দেন।
তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে ভালো উপায় হলো এলাকাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেন শিশুরা তাদের বাড়ির কাছের স্কুল-কলেজেই পড়তে পারে। তখন এলাকার শিক্ষিত, সচেতন অভিভাবক, সরকারি কর্মকর্তা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এলাকার স্কুল-কলেজগুলোর মান বাড়াতে চাপ সৃষ্টি করবেন। এতে বৈষম্য কমে যাবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই নিয়ম চালু আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশের ভালো শিক্ষার্থীরা শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট কলেজে পড়তে চায়। আমাদের এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে যে একটি বিশেষ কলেজই কেবল ভালো হতে পারে।’
ক্যাম্পাসে অস্থিরতা ও পরীক্ষার মান
অধ্যাপক ওয়াহিদুজ্জামানের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক অস্থিরতা, শিক্ষকদের হয়রানি এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার কারণেও ফলাফল খারাপ হয়েছে।
গত দুই বছরে শিক্ষক-অধ্যক্ষদের পদচ্যুতি, প্রতিষ্ঠান কার দখলে থাকবে তা নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং ক্যাম্পাস সহিংসতার মতো ঘটনার মধ্য দিয়েই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
পাশাপাশি, প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও পরীক্ষাগুলো বিজ্ঞানসম্মত ও মানসম্মত হয়েছে কি না তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অধ্যাপক ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘একটি মানসম্মত প্রশ্নে সহজ, মাঝারি ও কঠিন—সব ধরনের প্রশ্ন থাকা উচিত। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা পাসের সুযোগ পাবে, ভালো শিক্ষার্থীরা নিজেদের যোগ্যতা দেখাতে পারবে এবং মেধাবীরা সেরা ফলাফল অর্জন করতে পারবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবাই জিপিএ-৫ পাবে এমন আশা করা বোকামি। তবে খারাপ ফলাফলের কারণে অজস্র শিক্ষার্থীর হতাশায় ভেঙে পড়াটাও কাম্য নয়।’
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের অধ্যক্ষ তাজুল ইসলাম প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা, নিয়মিত ক্লাস এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ যত্নের ওপর জোর দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘ভালো ফল পেতে হলে প্রতিষ্ঠানের আন্তরিকতা ও নজরদারি জরুরি। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত ক্লাসে আনা, শিক্ষকরা ঠিকমতো পড়াচ্ছেন কি না তা দেখা, নিয়মিত পরীক্ষা ও কুইজ নেওয়া এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।’


