চলতি ২০২৬ সালের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর দেশের শিক্ষাঙ্গনে রীতিমতো ঝড় উঠেছে। সারা দেশেই শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ হওয়ার করুণ চিত্র। দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে সার্বিক পাসের হার নাটকীয়ভাবে কমে নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। এর মানে প্রায় অর্ধেক পরীক্ষার্থীই ফেল করেছে। গত ২২ বছরের মধ্যে এটিই সবচেয়ে কম পাসের হার, যা আগের বছর ছিল ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশ।
এ বছর মোট ১২ লাখ ৪০ হাজার ৭৯৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছে ৬ লাখ ৪৬ হাজার ৬৮৫ জন, আর ফেল করেছে ৫ লাখ ৯৪ হাজার ১১৩ জন। জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও কমে মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জনে দাঁড়িয়েছে, যা ছিল ২০২৪ সালে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯১১ এবং ২০২৫ সালে ৬৯ হাজার ০৯৭ জন।
এ ছাড়া, শতভাগ ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২০৪ থেকে বেড়ে ছাড়িয়ে গেছে ২০৯টি। বিশেষ করে ইংরেজি আর আইসিটি বিষয়ে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি হোঁচট খেয়েছে।
টানা দ্বিতীয়বারের মতো এইচএসসিতে পাসের হার কমল। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৮ শতাংশ, ২০২৫ সালে কমে দাঁড়ায় ৫৮ দশমিক ৮৩ শতাংশে, আর এখন তা নেমে এসেছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশে। অর্থাৎ, মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার ২৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ কমে গেছে। পাসের হার এভাবে লাগাতার কমে যাওয়ায় শিক্ষার আসল মান, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি এবং পড়াশোনার পরিবেশ নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছর শিক্ষক সংকট বা প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যার কথা বলা হলেও, এবারও ফল খারাপ হওয়ায় বোঝা যায় পুরোনো সমস্যাগুলোর কার্যকর সমাধান হয়নি।
কঠোর মূল্যায়ন ও পড়াশোনার চাপ
শিক্ষাবিদদের মতে, এই ধসের পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। গত দুই বছর ধরে শিক্ষার্থীরা সম্পূর্ণ সিলেবাসে পরীক্ষা দিচ্ছে। যাদের একটু বাড়তি সময় ও প্রস্তুতি দরকার ছিল, তাদের জন্য পুরো সিলেবাসে পরীক্ষা দেওয়া বেশ বড় একটা মানসিক চাপ তৈরি করেছিল।
তা ছাড়া, আগের মতো উদার হাতে নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার দিন শেষ। এবার পরীক্ষকরা কোনো রকম ছাড় না দিয়ে খাতা খুব কড়াভাবে দেখেছেন। কেন্দ্রগুলোতে কড়া নজরদারি ও শৃঙ্খলা থাকার কারণেও হুট করে পাসের হার অনেক কমে গেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল মানসিক ধাক্কা। ২০২৬ সালের এই পরীক্ষার্থীরা এমন সময়ে কলেজে ভর্তি হয় যখন দেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ঘটেছিল। এর পরের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা পড়াশোনার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে। অনেক শিক্ষার্থীই এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেনি। ফলস্বরূপ নিয়মিত ক্লাস করা এবং মনোযোগ দিয়ে পড়ার অভ্যাস তাদের মধ্যে একরকম হারিয়েই গিয়েছিল।
সরকার ও দায়িত্বশীলদের বক্তব্য
ফল বিপর্যয় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, এমন ধস ‘কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়’ এবং এটি অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। তিনি বলেন, এই ফলাফল দেখিয়ে দেয় যে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, শিক্ষাদান পদ্ধতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যারা মাত্র এক বা দুই বিষয়ে ফেল করেছে, এমন প্রায় ৪ লাখ ২২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য এক মাসের মধ্যে বিশেষ পরীক্ষার ব্যবস্থা করার ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি, দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট দূর করা এবং পড়াশোনার শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনার কাজও চলছে বলেও জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, সরকার প্রথমবার কোনো ধরনের কারচুপি ছাড়া একদম নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছভাবে খাতা মূল্যায়ন করিয়েছে। যোগ্যদের সঠিক মূল্যায়নের পাশাপাশি প্রথমবারের মতো খাতা পুনঃনিরীক্ষণের বড় সুযোগও দেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষাবিদদের ভাবনা
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। অমৃত লাল দে কলেজের অধ্যাপক দেবাশীষ চক্রবর্তী একটি দৈনিক পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এই ফলাফল শিক্ষার্থীদের আসল প্রস্তুতিটাই ফুটিয়ে তুলেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ক্লাসরুমে না পড়ে যদি শিক্ষার্থীরা শুধু নোট বা কোচিংয়ের ওপর ভরসা করে, তবে ফল আরও খারাপ হবে।
সহকারী অধ্যাপক দুলাল মজুমদার শিক্ষকদের উদাসীনতা, প্রাইভেট ও গাইড বইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং পড়াশোনায় অভিভাবকদের তদারকির অভাবকে দায়ী করেছেন। তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, ফলাফল দেখে খারাপ লাগলেও এটি দেশের আসল শিক্ষার বাস্তব চিত্র। সবার দায়িত্বশীল হওয়া ছাড়া এই অবস্থা থেকে উত্তরণ সম্ভব নয়।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বনাম বাস্তবতা
স্বভাবতই ফলাফল খারাপ হওয়ায় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা ভীষণ ক্ষুব্ধ। তাদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্র অতিরিক্ত কঠিন করা হয়েছিল এবং হঠাৎ নিয়ম বদলানো হয়েছে। অনেকের মতে, বর্তমান পরীক্ষার পদ্ধতিগুলো শুধু গোটা বই মুখস্থ করার ওপর জোর দেয়, যা দিয়ে বিষয়বস্তু কতটা বোঝা গেল তা মাপা যায় না।
তবে শিক্ষাবিদদের একটি বড় অংশ এই অবস্থাকে ‘সংকট’ বলতে রাজি নন। তাদের মতে, এটি বহুদিনের জমিয়ে রাখা এক কঠিন সত্যের মুখোমুখি হওয়ার সময়। খাতা দেখার এই কড়াকড়ি ভুয়া ও অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার প্রবণতা দূর করে শিক্ষার মান বাড়াতে সাহায্য করবে। এ ছাড়া, গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার কলেজগুলোতে মোবাইল গেম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত আসক্তি এবং পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহও ফল খারাপ হওয়ার বড় কারণ।
এই ধারাবাহিক পতন ঠেকাতে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষাব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষজ্ঞরা কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দিয়েছেন। প্রথমত, ইংরেজি, উচ্চতর গণিত এবং বিজ্ঞানের মতো কঠিন বিষয়গুলোর ভিত্তি শক্ত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কোচিংয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিয়মিত ক্লাস, পরীক্ষা ও বাড়ির কাজ করার ওপর জোর দিতে হবে।
পরিশেষে, নগর-মহানগর আর গ্রাম-শহরের এলাকাভিত্তিক বৈষম্য দূর করা, খালি পদে শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষাঙ্গনকে রাজনীতির হাত থেকে মুক্ত রাখতে পারলেই কেবল দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব।
লেখক: ডেপুটি এডিটর, টাইমস অব বাংলাদেশ


