সরু গলির দুই পাশে পুরোনো ভবন। মাথার ওপর আলোকসজ্জা, গলির মুখে পূজামণ্ডপ। ঢাকের বাদ্যি ও শঙ্খধ্বনিতে মুখর শাঁখারীবাজার। প্রতিমা দেখতে বাড়ির বারান্দা ও ছাদে ভিড় করেছেন বাসিন্দারা। পাশের তাঁতিবাজারেও উৎসবের আমেজ। পুরান ঢাকার এসব সরু গলিতেই শত বছর ধরে টিকে আছে দুর্গাপূজার ঐতিহ্য।
আজ শুক্রবার মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা। জায়গার সংকট ও ঘিঞ্জি পরিবেশের মধ্যেও স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও আয়োজকদের উদ্যোগে প্রতিবছর বসে পূজামণ্ডপ। ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি এসব পূজা হয়ে ওঠে পাড়ার মানুষের মিলনমেলা।
এ বছর শাঁখারীবাজার ও তাঁতিবাজার এলাকায় ২৩টি, সূত্রাপুর এলাকায় ২৫টি মণ্ডপ রয়েছে। উৎসব ঘিরে এসব মণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ঢাকায় দুর্গাপূজার ইতিহাস কয়েক শতাব্দীর পুরোনো। ইতিহাসবিদ ও অর্থনীতিবিদ ভবতোষ দত্ত তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ১৮৩০ সালের দিকে সূত্রাপুরের মৈসুন্ডিতে নন্দলাল বাবুর বাড়িতে বড় আয়োজনে দুর্গোৎসব হতো। তখন প্রায় দোতলা সমান উঁচু প্রতিমা তৈরি করা হতো। শুরুতে জমিদার ও বনেদি পরিবারের অন্দরমহলে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরে পাড়ায় পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ে দুর্গাপূজা।
বিংশ শতাব্দীর তিরিশের দশক থেকে পারিবারিক আয়োজনের বাইরে সর্বজনীন পূজার প্রসার ঘটে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাড়াভিত্তিক আয়োজন আরও গুরুত্ব পায়। স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও তরুণেরা সম্মিলিতভাবে পূজার আয়োজন শুরু করেন। গলির মুখে গড়ে ওঠে মণ্ডপ।
পুরান ঢাকার দুর্গাপূজার ঐতিহ্যে শাঁখারীবাজারের বিশেষ পরিচিতি রয়েছে। মুঘল আমল থেকে শাঁখাশিল্পীদের বসবাসের জন্য পরিচিত এ এলাকার পুরোনো ভবনগুলোর মাঝেই তৈরি হয় পূজামণ্ডপ। পূজার সময় দর্শনার্থীদের ভিড়ে গলিতে চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকে বাড়ির বারান্দা ও ছাদ থেকে প্রতিমা দেখেন।
শাঁখারীবাজারের প্রবীণ বাসিন্দা ও পূজা আয়োজক সাধন কুমার শাঁখারি বলেন, ‘আমাদের বাপ-দাদার আমল থেকেই দেখে আসছি, গলিতে শত বছর ধরে পূজা-পাঠ হয়ে আসছে। উৎসবের দিনে সরু গলিতে পা ফেলার উপায় থাকে না। চারপাশের বাড়ির বারান্দা ও ছাদ থেকে মানুষ প্রতিমা দেখেন। জায়গা ছোট হলেও আমাদের প্রাণের টান ও আনন্দের পরিমাপ করা সম্ভব নয়।’
শাঁখারীবাজারের পাশের তাঁতিবাজার ও স্বর্ণকারপট্টিতেও দুর্গাপূজার দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, স্বর্ণশিল্পী ও বসাক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে ১৯২০-এর দশক থেকে তাঁতিবাজারে পূজার আয়োজন শুরু হয়। প্রতিমার কারুকাজ, মণ্ডপসজ্জা ও আলোকসজ্জার জন্য এলাকাটি পরিচিত।
তাঁতিবাজারের ব্যবসায়ী রতন চন্দ্র বসাক বলেন, ‘আগে মহাজন থেকে কারিগর, সবাই মিলে রাতের পর রাত জেগে গলির প্যান্ডেল সাজাতাম। সময়ের সঙ্গে মণ্ডপ ও আলোকসজ্জায় আধুনিকতা এসেছে। তবে গলির ভেতরের পুরোনো আন্তরিকতা ও সাবেকি আমেজ বদলায়নি।’
লক্ষ্মীবাজারে স্থানীয় বাসিন্দা ও তরুণদের উদ্যোগে সর্বজনীন পূজার প্রসার ঘটে। সূত্রাপুরের মৈসুন্ডি ও ফরাশগঞ্জের পুরোনো বাড়ির পূজাও এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অংশ। বাংলাবাজারে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ছাপাখানার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অংশগ্রহণে পূজার আয়োজন ছড়িয়ে পড়ে।
সূত্রাপুরের প্রবীণ নাগরিক ও স্থানীয় ইতিহাস অনুরাগী অমরেশ চন্দ্র কর বলেন, ‘পুরান ঢাকার গলির পূজা শত বছরের সম্প্রীতির বন্ধন। ঘিঞ্জি গলিতে প্রতিমা বসলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পুরো পাড়ার মানুষ এক হয়ে যায়। এ সামাজিক ঐক্যই পুরান ঢাকাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।’
উৎসব নির্বিঘ্ন রাখতে মণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, মণ্ডপগুলোতে ২৪ ঘণ্টা পুলিশি উপস্থিতি ও সিসিটিভি নজরদারির ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের দিন শোভাযাত্রা ও জনসমাগমের নিরাপত্তায়ও বিশেষ নজরদারি থাকবে।
তাঁতিবাজার পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজয় সাহা বলেন, ‘আজ ষষ্ঠীর মাধ্যমে দুর্গাপূজা শুরু হয়েছে। প্রশাসনের সহযোগিতা ও নিরাপত্তায় আমরা পূজা উদ্যাপন করছি। আগামী পাঁচ দিনও নির্বিঘ্নে উৎসব শেষ হবে বলে আশা করছি।’
কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সার্বিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছি। নারী ও পুরুষ পুলিশ, আনসার এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।’
পঞ্জিকা অনুযায়ী, ১৭ ও ১৮ অক্টোবর মহাসপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী। শেষ দিনে সিঁদুর খেলা ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার পর প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দুর্গোৎসব।
পুরান ঢাকার গলিতে পূজার আয়োজন করতে প্রতিবছর জায়গার সংকট, মানুষের চলাচল ও দোকানপাটের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়। তবু সময়ের পরিবর্তনেও বদলায়নি আয়োজনের মূল সুর। শাঁখারীবাজার থেকে তাঁতিবাজার, পুরোনো ভবন ও সরু গলির মধ্যে আজও টিকে আছে পূজা-পাঠের ঐতিহ্য। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরান ঢাকার ইতিহাস, মানুষের বন্ধন ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দীর্ঘ স্মৃতি।


