ইউক্যালিপটাস: তৃষ্ণার্ত বৃক্ষের করাল গ্রাস

ইউক্যালিপটাস: তৃষ্ণার্ত বৃক্ষের করাল গ্রাস
ইউক্যালিপটাস গাছ। ছবি: জাকির হোসেইন/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুপাশের সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই উপজেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ একটি অঞ্চল। একসময় দ্রুত সবুজায়ন কিংবা লাভজনক কাঠ উৎপাদনের আশায় পাহাড়ের পাদদেশে, রেললাইনের পাশে এবং মহাসড়কের দুই ধারে বিপুলসংখ্যক ইউক্যালিপটাস গাছ লাগানো হয়েছিল।

কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দ্রুতবর্ধনশীল এই বিদেশি প্রজাতির গাছ পরিবেশ, প্রকৃতি ও স্থানীয় মানুষের জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

ছবি: জাকির হোসাইন/ টাইমস

 

ইউক্যালিপটাস গাছ পরিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর, তা নিয়ে পরিবেশবিদদের গবেষণায় বিভিন্ন উদ্বেগজনক বিষয় উঠে এসেছে। পাহাড় ও সমতলের অপূর্ব মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলে ইউক্যালিপটাস প্রচুর পানি শোষণকারী গাছ হিসেবে মাটি থেকে বিপুল পরিমাণ পানি শুষে নেয়। ফলে দ্রুত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে এবং তীব্র সুপেয় পানির সংকট সৃষ্টি হচ্ছে।

একই সঙ্গে, এর পাতার তীব্র গন্ধের কারণে পাখি ও মৌমাছি এখানে বাসা বাঁধতে বিশেষ আগ্রহী নয়। এ ছাড়া, এই গাছের নিচে ঘাস জন্মায় না বললেই চলে। ফলে জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যশৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে, পাহাড়ের ঢালে ইউক্যালিপটাস গাছের শিকড় মাটিকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরে রাখতে পারে না বলে ভারী বৃষ্টিপাতের সময় ভূমিধসের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

ছবি: জাকির হোসাইন/ টাইমস

 

আরও পড়ুন

পরিবেশের ক্ষতির পাশাপাশি, সহজে ও লাভজনকভাবে ইউক্যালিপটাস চাষ করা যাবে–এমন ধারণা থেকে যারা এই গাছ লাগিয়েছিলেন, সেই স্থানীয় কৃষক ও জমির মালিকরাও দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এই গাছের শিকড় চারদিকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের জমি থেকে আর্দ্রতা ও পুষ্টি উপাদান শোষণ করে নেয়। ফলে ধান ও শাকসবজির কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া যাচ্ছে না।

এ ছাড়া, ইউক্যালিপটাসের কাঠ নরম ও ভঙ্গুর হওয়ায় তা আসবাবপত্র কিংবা ঘরবাড়ি নির্মাণের জন্য বিশেষ উপযোগী নয়। ফলে বাজারে দেশীয় মেহগনি বা রেইনট্রির কাঠের তুলনায় এর চাহিদা ও দাম অনেক কম।

ছবি: জাকির হোসাইন/ টাইমস

 

যে গাছকে একসময় দ্রুত সবুজায়নের সহজ সমাধান হিসেবে দেখা হয়েছিল, দীর্ঘমেয়াদে সেটিই এখন ধীরগতির এক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে। দ্রুত সবুজায়নের যে প্রতিশ্রুতি এই গাছ দিয়েছিল, বাস্তবে তা মাটির পানিসম্পদ নিঃশেষ করেছে, মাটির উর্বরতা কমিয়েছে এবং কৃষকদের বিনিয়োগের বিপরীতে সামান্যই সুফল দিয়েছে। এই সংকট মোকাবিলা এবং সীতাকুণ্ড ও মীরসরাই অঞ্চলের পরিবেশ ও কৃষিকে রক্ষা করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।

মহাসড়কের পাশের এবং কৃষিজমির আইলে থাকা ইউক্যালিপটাস গাছগুলো পর্যায়ক্রমে কেটে ফেলে সেখানে আম, জাম, কাঁঠাল, অর্জুন, মেহগনি ও কদমের মতো দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগাতে হবে। এর মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের উদ্যোগে জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সাময়িক লাভের লোভে ইউক্যালিপটাস চাষের বিস্তার ঘটানো ছিল আত্মবিনাশী একটি সিদ্ধান্ত।

প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে এই গাছের বিস্তার রোধ করে দেশীয় বৃক্ষসম্পদ গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি।

ছবি: জাকির হোসাইন/ টাইমস

 

পাহাড়, সমতল আর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যে ঘেরা এই অঞ্চলের সামনে এখন দুটি পথ খোলা–সাময়িক লাভের আশায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকে মেনে নেওয়া, অথবা দেশীয় গাছ ফিরিয়ে এনে প্রকৃতির ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা। যে গাছগুলো একসময় মাটিকে আঁকড়ে ধরে রাখত, পানির ভারসাম্য রক্ষা করত এবং কৃষকের জীবিকাকে সুরক্ষা দিত, সেগুলো ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।

ইউক্যালিপটাস রোপণ করা হয়েছিল সবুজ ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে। অথচ সেই স্বপ্ন আজ রূপ নিয়েছে পানির সংকট, মাটিক্ষয় আর অনুশোচনায়। এখনই সময় ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রকৃতি ও কৃষিকে রক্ষার পথে এগিয়ে যাওয়ার।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad