চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) স্বাস্থ্য বিভাগে ২১ বছর ধরে আয়া পদে চাকরি করেছেন ৫২ বছর বয়সী রত্না আচার্য। তার বেতনের টাকায় চলত সংসার। বাসাভাড়া, বাজার খরচ থেকে শুরু করে পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনীয় ব্যয়- সবই মেটাতে হতো তার আয়ে। কিন্তু গত জুলাই থেকে তার বেতন বন্ধ। সংসারের খরচ জোগাতে ধারদেনা করতে হচ্ছিল তাকে। বেতন না পাওয়া, দেনা ও সংসার চালানোর দুশ্চিন্তার মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন রত্না। গত রোববার রাতে মারা যান তিনি।
রত্না আচার্য চট্টগ্রাম নগরের ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কর্মরত ছিলেন। তার মেয়ে রীমা আচার্য টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, তার মা ছিলেন পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ভাই এখনো পড়াশোনা করছে। কিছুদিন আগে স্নাতক শেষ করে তিনিও একটি চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। তবে সংসারের মূল দায়িত্ব ছিল মায়ের ওপর।
রীমা আচার্য বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার মা শেষ অফিস করেন। বাসায় ফেরার পর থেকে তাকে খুব দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখাচ্ছিল। শনিবার বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ভর্তি করাই। চিকিৎসকেরা জানান, মা ব্রেন স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাক করেছেন। পাশাপাশি নিউমোনিয়াও হয়েছিল। রোববার রাতে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) নিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তার আগেই মা মারা যান।’
রত্নার মৃত্যুর পর তার পরিবারের ওপর নেমে এসেছে আর্থিক অনিশ্চয়তা। যে বেতনের ওপর নির্ভর করে চলত সংসার, সেই বেতনই গত জুলাই থেকে বন্ধ ছিল।
একই পরিস্থিতিতে রয়েছেন চসিকের স্বাস্থ্য বিভাগের আরও ৩৬২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের অভিযোগ, প্রশাসনিক জটিলতায় বেতন আটকে থাকায় বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনার খরচ, বাজারসদাই ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। কেউ কেউ ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ১৯৯৮ সালে আরবান হেলথ কেয়ার প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম নগরে পাঁচটি মাতৃসদন ও ৪৩টি নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। ২০০১ সালের জানুয়ারি থেকে এসব কেন্দ্রে স্বাস্থ্যসেবা চালু হয়। পরে নগরবাসীকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দিতে দ্বিতীয় পর্যায়ে ‘আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারি প্রজেক্ট-২’ নেওয়া হয়। প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত।
দুই আরবান প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রাম নগরের ৪১টি ওয়ার্ডের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে প্রতি কেন্দ্রে ৮ থেকে ১০ জন কর্মী কাজ করেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মেডিকেল অফিসার, কাউন্সেলর, ফিল্ড সুপারভাইজার, প্যারামেডিকস, ল্যাব টেকনিশিয়ান, প্রশাসনিক সহকারী, রিসেপশনিস্ট, সার্ভিস প্রমোটর, আয়া-কাম-ক্লিনার এবং মেসেঞ্জার-কাম-সিকিউরিটি কর্মী। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে নগরবাসীকে বিনামূল্যে ১৬ ধরনের স্বাস্থ্যসেবা এবং স্বল্পমূল্যে অন্যান্য সেবা দেওয়া হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন ও ২৩টি পৌরসভায় মোট ১৯২টি আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সেন্টার পরিচালিত হয়। গত ২২ এপ্রিল সরকার এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ৭ জুন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মী এবং আরবান প্রকল্পের মোট ৩৬৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সিভিল সার্জন কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।
কিন্তু হস্তান্তরের পর থেকেই বেতন-ভাতা নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। জুন মাসের বেতন সিটি করপোরেশন থেকে পেলেও জুলাই থেকে আর বেতন পাননি কর্মীরা। জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর- টানা তিন মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। অক্টোবর মাসের বেতনও কবে দেওয়া হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, এই সংকট সমাধানের জন্য অনলাইনে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে ১২ অক্টোবর। অনলাইনের এই সভায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি), অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি), বিভাগীয় পরিচালকবৃন্দ, সংশ্লিষ্ট সিভিল সার্জনগণ, সিটি কর্পোরেশনের প্রতিনিধিগণ এবং বিভিন্ন এনজিও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আগামী মার্চ পর্যন্ত আগের নিয়মেই বহাল থাকবে। স্বাস্থ্যকর্মীরা সিটি কর্পোরেশনের অধীনে যার যার পূর্ববর্তী স্থানে থেকে কাজ চালিয়ে যাবেন এবং সিটি কর্পোরেশনই তাদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করবে। আগামী মার্চের মধ্যে সরকারের সাথে একটি এমওইউ স্বাক্ষরিত হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে। সাতদিনের মধ্যে এই সংক্রান্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি ইস্যু হওয়ার কথা রয়েছে।
কর্মীদের অভিযোগ, এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে দায়িত্ব হস্তান্তর করা হলেও বেতন-ভাতা দেওয়ার প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়নি। চসিকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কর্মীদের সিভিল সার্জন কার্যালয়ে হস্তান্তরের পর তাদের বেতন দেওয়ার দায়িত্ব আর সিটি করপোরেশনের নেই। অন্যদিকে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় মন্ত্রণালয় থেকে তাদের বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। দুই পক্ষের এই অবস্থানের মধ্যে আটকে আছে কর্মীদের বেতন।
চসিকের ১২ নম্বর পাহাড়তলী ওয়ার্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্বাস্থ্যকর্মী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, গত ৭ জুন তাদের হস্তান্তর করা হয়। জুন মাসের বেতন সিটি করপোরেশন থেকে পেয়েছিলেন। এরপর জুলাই থেকে আর বেতন পাননি।
তিনি বলেন, ‘চার মাস ধরে বেতন নেই। বাসাভাড়া, সন্তানদের স্কুলের বেতন ও সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকে ঋণ করে চলছেন। কিন্তু এভাবে আর কত দিন চলা সম্ভব? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে কবে বেতন দেওয়া হবে, সেটাও কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না।’
কর্মীরা জানান, দীর্ঘদিন চাকরি করেও এখন তাদের সংসার চালানোর জন্য অন্যের কাছে ধার করতে হচ্ছে। বেতন বন্ধ থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয় মেটানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। স্থায়ী কর্মীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ তহবিল (পিএফ), গ্র্যাচুইটি, অর্জিত ছুটির টাকা ও বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের পাওনা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
তাদের দাবি, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অধীনে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি কার্যকর হলেও আগের চাকরির সুযোগ-সুবিধা কীভাবে বহাল থাকবে, সে বিষয়ে লিখিত নিশ্চয়তা দেওয়া হয়নি। এই অনিশ্চয়তা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
বেতন-ভাতা চালুর দাবিতে কর্মীরা চসিকের মেয়র, সচিব, চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ও বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে এখনো সমস্যার সমাধান হয়নি।
চসিকের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ইমাম হোসাইন রানা বলেন, গত জুলাই মাস থেকে সিটি কর্পোরেশনের ডাক্তার, নার্স, আয়াসহ বিভিন্ন ক্যাটাগরির কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন সাময়িকভাবে বন্ধ ছিল। স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে প্রকল্প ও স্থাপনাগুলো হস্তান্তরের একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। শুরুতে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তড়িঘড়ি করতে গিয়ে কিছু বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়, যার ফলে বেতন প্রদান স্থগিত রাখা হয়েছিল। এই হস্তান্তর প্রক্রিয়াটি কেবল আমাদের সিটি কর্পোরেশনেই নয়, বরং ঢাকা উত্তর-দক্ষিণ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ সারা বাংলাদেশের ১৯২টি স্বাস্থ্য স্থাপনার ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য।
তিনি বলেন, ১২ই অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনলাইন সভায় নির্দেশনা ও মেয়র শাহাদাত হোসেনের উদ্যোগে এর ইতিবাচক সমাধান এসেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে বকেয়াসহ ২০২৭ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সমস্ত বেতন সিটি কর্পোরেশনের আওতাতেই পরিশোধ করা হবে। চলতি সপ্তাহেই মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক চিঠি পৌঁছানোর সাথে সাথে দ্রুত বকেয়া বেতন ছাড়ের ব্যবস্থা নেওয়া করা হবে। একই সঙ্গে আগামী ৪ থেকে ৬ মাসের মধ্যে নতুন সমঝোতা স্মারক চূড়ান্তকরণ ও তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে স্থায়ী ও অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবসরকালীন পেনশন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে।
চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) সেখ ফজলে রাব্বি বলেন, চলমান কার্যক্রম আগামী মার্চ পর্যন্ত আগের নিয়মেই বহাল থাকবে। স্বাস্থ্যকর্মীরা সিটি কর্পোরেশনের অধীনে যার যার পূর্ববর্তী স্থানে থেকে কাজ চালিয়ে যাবেন এবং সিটি কর্পোরেশনই তাদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করবে। আগামী মার্চের মধ্যে সরকারের সাথে একটি চুক্তি বা এমওইউ স্বাক্ষরিত হবে। উক্ত এমওইউ-এর আলোকেই স্থায়ী, অস্থায়ী ও প্রজেক্টে কর্মরত কর্মচারীদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া হবে।


