নৌকা ছেড়ে ডাঙ্গায় স্থায়ী ঠিকানায় বেদে সম্প্রদায়

নৌকা ছেড়ে ডাঙ্গায় স্থায়ী ঠিকানায় বেদে সম্প্রদায়
মাদারীপুরে নৌকা ছেড়ে ডাঙ্গায় স্থায়ী বেদে সম্প্রদায়। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

প্রজন্মের পর প্রজন্ম নৌকায় ভেসে দিন কাটিয়েছেন বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ। নদীর এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে ঘুরে বেড়ানো আর সাপ খেলা, ঝাড়ফুঁক, সিঙা লাগানো কিংবা সিঙা-তাবিজ বেচেই চলত তাদের সংসার। কিন্তু সেই চিরচেনা দিন এখন পাল্টাচ্ছে। ভাসমান জীবন ছেড়ে তারা ডাঙ্গায় স্থায়ী হচ্ছেন, ধরছেন নতুন পেশা, আর সন্তানদের পাঠাচ্ছেন স্কুলে।

মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পরিত্যক্ত পাচ্চর-কাওড়াকান্দি সড়কের পাশে প্রায় ২০ বছর ধরে বাস করছে অন্তত ৫০টি বেদে পরিবার। আড়াই শয়ের বেশি মানুষের এই জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে যাযাবর জীবন পেছনে ফেলে স্থায়ী ঘরবাড়ি বানিয়েছে, বেছে নিয়েছে নতুন জীবিকা।

বাপ-দাদার পুরনো পেশা ছেড়ে অনেকে এখন ব্যাটারিচালিত ভ্যান চালাচ্ছেন, আইসক্রিম বিক্রি করছেন, আবার কেউ ধরেছেন রাজমিস্ত্রির কাজ। আয়-রোজগার ভালো হওয়ায় অনেকে ঝুপড়ি ঘর ভেঙে তুলছেন শক্তপোক্ত স্থায়ী বাড়ি।

এসব পরিবারের ছেলেমেয়েরা এখন পাশের প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় পড়তে যাচ্ছে। যদিও মাধ্যমিক পার হওয়ার আগেই অনেকে পড়াশোনা ছেড়ে কাজে নেমে পড়ে, তবে যাদের আর্থিক অবস্থা একটু ভালো, তারা সন্তানদের উঁচুধাপে পড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন।

বেদেদের এক ঐতিহ্যবাহী গান ‘এক ঘাটেতে রান্ধি-বাড়ি, আর এক ঘাটে খাই। আমাদের সুখের সীমানা নাই।’ তবে তাদের জীবনবদল এই গানের চিত্রটাই পাল্টে দিয়েছে।

মাদবরেরচর ইউনিয়নে সরকারের ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’-এর ঘরগুলোর পাশে, পরিত্যক্ত সড়কের দুই ধারে সারি সারি গড়ে উঠেছে তাদের ছোট-বড় ঘরবাড়ি।

স্থানীয় বেদেরা জানান, তাদের পূর্বপুরুষেরা মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর থেকে নৌকায় করে শিবচরে আসেন। নদীর তীরে কিছুদিন থাকার পর তারা এখানেই স্থায়ী বসতি গড়েন।

আরও পড়ুন

হাসিবুল নামে এক বেদে সদস্য বলেন, পুরনো কাজের চাহিদা কমে যাওয়ায় তারা নতুন পেশায় যেতে বাধ্য হয়েছেন। টাইমস’কে তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায় ২০ বছর ধরে এখানে আছি। প্রথমে রাস্তার পাশে তাঁবু টাঙিয়ে থাকতাম, বাপ-দাদার পেশাই করতাম। কিন্তু মানুষ এখন আর এসব ঝাড়ফুঁক বিশ্বাস করে না, আয়ও কমে গেছে। তাই পেশা বদলাতে হয়েছে।’

তিনি আরও জানান, কাজ বদলানোর পর থেকে সংসারে আয় বেড়েছে, আর পুরনো পেশার ওপর নির্ভরতাও কমে গেছে।

দয়াল সরদার নামের আরেকজন জানান, নদী শুকিয়ে যাওয়াও এই পরিবর্তনের বড় কারণ। তিনি বলেন, ‘নদীগুলো শুকিয়ে ছোট হয়ে আসছে, নৌকায় চলাফেরা করা কঠিন। আমরা নৌকায় এসেছিলাম, কিন্তু আর ভাসমান জীবনে ফিরে যাইনি। ঘর বানিয়ে ২০ বছর ধরে এখানেই আছি।’

দয়াল জানান, অনেকেই এখন এখানকার ভোটার হয়েছেন। অনেকে আবার স্থানীয় পরিবারে বিয়ে করে এলাকার মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘আগে আমাদের পড়ার সুযোগ ছিল না। এখন আমরা ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছি। সাধারণ মানুষের পাশে থেকে আমাদের বাচ্চারাও পড়তে আগ্রহ পাচ্ছে।’

বেদে নারীদেরও কাজের ধরন বদলে যাচ্ছে। কুলসুম নামের এক নারী জানান, আগে তিনি গ্রামে ঘুরে সিঙা লাগাতেন আর বাত-ব্যথার ওষুধ বেচতেন। তিনি বলেন, ‘এখন আর ওসব কেউ নেয় না। পুরুষরা অন্য কাজ করছে, নারীদের মধ্যেও পরিবর্তন এসেছে। এখন আর আগের মতো নারীরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়ায় না।’

স্থানীয়রা জানান, এলাকাটিতে ৪০ থেকে ৫০টির মতো বেদে পরিবার স্থায়ী হয়েছে। সমাজের ‘সরদার’ ব্যবস্থা এখনও থাকলেও, পরিবারগুলো পাশের সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছে।

মাদবরেরচর ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সুলতানা ফেরদৌসী টাইমস’কে বলেন, ‘এসব পরিবার এখন পুরোপুরি স্থায়ী বাসিন্দা। আগে তারা ভেসে ভেসে থাকত। এখন পরিত্যক্ত রাস্তার পাশে ঘর তুলে থাকছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও তাদের সাহায্য করা হচ্ছে।’

প্রতি সকালে কাজ নিয়ে বের হন পুরুষেরা, আর শিশুরা যায় স্কুল-মাদ্রাসায়। পড়াশোনার সুযোগ এখনো সীমিত হলেও, নিজেদের আর্থিক অবস্থা শক্ত করা আর সমাজের মূলধারায় মিশে যাওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad