সংবিধান সংশোধনে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাইরে বিকল্প পদ্ধতি রাখা, বিচার বিভাগের এখতিয়ার স্পষ্ট করা ও রাষ্ট্র পরিচালনার কিছু মূলনীতিকে মৌলিক অধিকারের আওতায় আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি।
একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার গঠনপ্রক্রিয়া, উচ্চকক্ষের প্রতিনিধিত্ব ও জনগণের সার্বভৌমত্ব আরও স্পষ্ট করার বিষয়ে মতামত দিয়েছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া শিক্ষক ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা।
মঙ্গলবার বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তথ্য জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আলোচকেরা সংবিধানের বিভিন্ন অংশে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের বিষয়ে মতামত দিয়েছেন। জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত না হওয়া কোন বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া উচিত, সে বিষয়েও তারা কথা বলেছেন। অনেকে লিখিত মতামত দিয়েছেন, অন্যরা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে দেবেন বলে জানিয়েছেন।’
সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে সালাহউদ্দীন আহমদ জানান, বর্তমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে সংশোধনের যে বিধান রয়েছে, তার পাশাপাশি অন্য পদ্ধতি রাখা যায় কিনা—তা নিয়ে মতামত এসেছে। সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় এমন ভারসাম্য প্রয়োজন, যাতে এটি অতিরিক্ত কঠোর বা নমনীয় না হয়ে পড়ে।
বিচার বিভাগের ক্ষমতা ও স্বাধীনতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়া ও মৌলিক কাঠামো নিয়ে বিচার বিভাগের এখতিয়ার কতটুকু হবে, তা স্পষ্ট করার পরামর্শ এসেছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রাষ্ট্রের এক অঙ্গ যাতে অন্য অঙ্গের ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।’
তিনি আরও জানান, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু অংশ আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। রাষ্ট্রের সামর্থ্য বিবেচনায় এসব মূলনীতির কিছু বিষয় মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আরও স্পষ্ট করার প্রস্তাব এসেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তবে গঠন ও প্রক্রিয়া নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পাওয়া যায়নি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্পগুলোর মধ্যে অন্য কোনো পদ্ধতিতে ঐকমত্য না হলে বিচার বিভাগকে শেষ উপায় হিসেবে রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন আলোচকেরা।
উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। সালাহউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘উচ্চকক্ষে কোন শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব থাকবে, প্রতিনিধিরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন ও আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে নাকি নিম্নকক্ষের আসনসংখ্যার অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, তা নিয়ে মতামত এসেছে।’
বৈঠকের এসব মতামত পর্যালোচনা করে কমিটিতে আলোচনা করা হবে। পরে প্রস্তাবগুলো পুস্তিকা আকারে সংকলন করা হবে।
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকা নিয়ে অধ্যাপক আলী রিয়াজের সমালোচনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে সালাহউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়া ঐকমত্য কমিশনের আলোচনার মাধ্যমে হয়েছে। বিরোধী দলকে বিশেষ কমিটিতে অংশ নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই তারা আলোচনায় আসুক। সরকারি ও বিরোধী দল সবাই মিলে সমঝোতার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধভাবে এই সংশোধনী গ্রহণ করতে চাই।’
বিরোধী দল অংশ না নিলেও সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা আমাদের অঙ্গীকার, আমরা অপেক্ষা করতে পারব না।’
তিনি উল্লেখ করেন, বিরোধী দলকে লিখিত মতামত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপনের পরও বিরোধী দল আলোচনায় অংশ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।


