দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দী মায়েদের সঙ্গে প্রায় ২৯৮ থেকে ৩০৩ জন শিশু অবস্থান করছে। শিশু আইন অনুযায়ী, এসব শিশু সুবিধাবঞ্চিত। তাদের জন্য বিকল্প পারিবারিক যত্ন, নিরাপদ আবাসন ও শিক্ষার ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেছে সমাজসেবা অধিদপ্তর।
হাইকোর্টে দাখিল করা প্রতিবেদনে অধিদপ্তর জানিয়েছে, কারাগারে থাকা শিশুদের প্রাথমিক বিকাশ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে খেলনা, পোশাক ও পুষ্টিকর শিশু খাদ্য সরবরাহের পাশাপাশি তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের চেষ্টা চলছে।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের শিশু সুরক্ষা ইউনিট ও প্রবেশন শাখার সমন্বিত মতামত এবং প্রতিবেদনের একটি অনুলিপি টাইমসের হাতে এসেছে। অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) পাঠানো ওই প্রতিবেদনে শিশুদের সুরক্ষার আইনি ভিত্তি, বিদ্যমান কার্যক্রম ও সেবাদানের পরিস্থিতি তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করা হয়েছে।
আইনে সুবিধাবঞ্চিত শিশু হিসেবে স্বীকৃতি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিশু আইন, ২০১৩-এর মূল দর্শন হলো শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষা করা। আইনের ধারা ৮৯(১)(৬) অনুযায়ী, কারাভোগরত মা-বাবার ওপর নির্ভরশীল অথবা কারাভোগরত মায়ের সঙ্গে কারাগারে থাকা শিশু সুবিধাবঞ্চিত শিশু হিসেবে গণ্য। ফলে এসব শিশুর জন্য বিশেষ সুরক্ষা, যত্ন-পরিচর্যা ও উন্নয়নমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুস্পষ্ট আইনগত ভিত্তি রয়েছে।
কোনো শিশুর ক্ষেত্রে অবহেলা বা অরক্ষিত অবস্থা দেখা গেলে তাৎক্ষণিকভাবে বিকল্প পরিচর্যার ব্যবস্থা নেওয়া সমাজসেবা অধিদপ্তরের অন্যতম দায়িত্ব বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ‘প্রবেশন অ্যান্ড আফটার কেয়ার সার্ভিসেস’ কার্যক্রম বর্তমানে দেশের ৬৪টি জেলা এবং আটটি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) আদালতসহ মোট ৭২টি ইউনিটে পরিচালিত হচ্ছে। এ কার্যক্রমের আওতায় নিবন্ধিত স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতি’ কাজ করছে।
মাঠপর্যায় থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্যের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি মায়েদের সঙ্গে প্রায় ২৯৮ থেকে ৩০৩ জন শিশু রয়েছে। প্রবেশন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে ওই সমিতির মাধ্যমে শিশুদের প্রাথমিক বিকাশ ও সুরক্ষার জন্য নিয়মিত খেলনা, পোশাক এবং পুষ্টিকর শিশু খাদ্য সরবরাহ করা হচ্ছে।
জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের অনুদান ও সমাজের হৃদয়বান ব্যক্তিদের স্বতঃস্ফূর্ত অনুদানে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে সরাসরি শিশু সুরক্ষা ইউনিটের আওতায় কারাগারে থাকা শিশুদের জন্য পৃথক কোনো কার্যক্রম নেই। প্রবেশন শাখার মাধ্যমে তাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
বিকল্প পারিবারিক যত্ন ও নিরাপদ আবাসনের সুপারিশ
সমাজসেবা অধিদপ্তরের মতে, কারাগারের পরিবেশ দীর্ঘমেয়াদে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য অনুকূল নয়। এ কারণে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ও সর্বোত্তম স্বার্থ রক্ষায় বিকল্প পরিচর্যার সুপারিশ করেছে অধিদপ্তর।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট বয়স বা সময়সীমা শেষে কারাবন্দী মায়ের সঙ্গে থাকা শিশুকে তার সর্বোত্তম স্বার্থ বিবেচনায় নিকটাত্মীয়ের কাছে ফস্টার কেয়ার বা বিকল্প পারিবারিক যত্নের আওতায় পুনর্বাসন করা যেতে পারে।
কোনো শিশুর ক্ষেত্রে নিকটাত্মীয়ের কাছে পুনর্বাসনের সুযোগ না থাকলে, অথবা সেখানে শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে, তাকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের আওতাধীন সরকারি শিশু পরিবার কিংবা উপযুক্ত নিরাপদ আবাসন কেন্দ্রে রাখার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সেখানে শিশুর লালন-পালন ও শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার সুপারিশও করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে অধিদপ্তর বলেছে, কারাগারে থাকা শিশুদের সর্বোত্তম স্বার্থ, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও স্বাভাবিক বিকাশকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় আইনি ও মানবিক ব্যবস্থা গ্রহণে তারা বদ্ধপরিকর।
দেশের কারাগারগুলোতে মায়েদের সঙ্গে কত শিশু রয়েছে, সে বিষয়ে একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৫ জুন তালিকা দাখিলের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী এবং বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রুলসহ এ আদেশ দেয়। দুই মাসের মধ্যে তালিকা দাখিল করতে বলা হয়েছিল। রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ দীপা। আদালতের ওই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতেই হাইকোর্টে প্রতিবেদন পাঠায় সমাজসেবা অধিদপ্তর।


