ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নতুন বিক্ষোভ সামনে রেখে দেশটির রাজধানী নয়াদিল্লিতে নজিরবিহীন নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন। দিল্লি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শনিবার যন্তর মন্তরে জনতার সমাবেশ নিয়ন্ত্রণে সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সেসের (সিএএফপি’স) ২৬ হাজারের বেশি সদস্যকে নিয়মিত পুলিশের পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তরুণ ছাত্র জনতার বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর এমন বিশাল প্রস্তুতি ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভারত সফর, দিল্লির বিধানসভা নির্বাচন ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়কার প্রস্তুতিকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সেসের ১১০টি অতিরিক্ত কোম্পানি মোতায়েনের অনুমতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এসব কোম্পানিতে রয়েছেন সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ), সশস্ত্র সীমা বল (এসএসবি), ভারত-তিব্বত সীমান্ত পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। জম্মু ও কাশ্মীর, পশ্চিমবঙ্গ এবং ছত্তিশগড় থেকেও অতিরিক্ত বাহিনী দিল্লিতে পৌঁছেছে।
সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ২২১টি কোম্পানি দিল্লি পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সবশেষ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের জন্য ২০০টিরও কম কোম্পানি দায়িত্বে ছিল। সে সময় বিধানসভা নির্বাচন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সফর এবং দিল্লির দাঙ্গা প্রায় একই সময়ে ঘটেছিল। নির্বাচনের জন্য আসা অতিরিক্ত বাহিনীকে পরে ট্রাম্পের নিরাপত্তার কাজে রাখা হয়েছিল। তিনি চলে যাওয়ার পর একই সদস্যদের আবার দাঙ্গা মোকাবিলায় পাঠানো হয়।’
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের খবরে বলা হয়, এবারের বিক্ষোভ আগের কর্মসূচিগুলো থেকে বেশ কয়েকটি কারণে আলাদা। দুই মাস আগে ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি’র প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে নামেন আন্দোলনকারীরা। এবার আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার।
এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের পরিচয়, তাদের দাবি এবং বিক্ষোভ মোকাবিলায় পুলিশের প্রস্তুতি—সবকিছুতেই পরিবর্তন এসেছে। ককরোচ জনতা পার্টির পাশাপাশি প্রায় একই সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের আলাদা আলাদা বিক্ষোভ কর্মসূচিও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আইনজীবীদের বিভিন্ন সংগঠনও দিল্লির পাতিয়ালা হাউস আদালত থেকে যন্তর মন্তর পর্যন্ত একই ধরনের পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছে।
আইনজীবী মেহমুদ প্রমোদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় বলেন, ‘যন্তর মন্তরের উদ্দেশে আমাদের পদযাত্রায় অংশ নিতে ১০ অক্টোবর সকাল ১১টায় পাতিয়ালা হাউস আদালতের ৪ নম্বর ফটকে বিপুলসংখ্যক আইনজীবীকে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।’
ভারতীয় কিষান ইউনিয়নের নেতা ও মুখপাত্র রাকেশ টিকায়েতও ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলনে সমর্থন জানিয়েছেন। বিক্ষোভে যোগ দিতে তাঁর দিল্লি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে কংগ্রেসের সংসদ সদস্য রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা এবং বিরোধী দলের অন্য নেতারা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ করছেন।
যন্তর মন্তর, নির্বাচন কমিশনের প্রধান কার্যালয়, আকাশবাণী ভবন, রাজঘাট ও কনট প্লেসে গত কয়েকদিন ধরেই বিক্ষোভ চলছে। ফলে পুলিশকে একাধিক স্থানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে এবং আন্দোলনকারীদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকতে হচ্ছে।
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরও বিরোধী দলের বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। শুক্রবার বিরোধী নেতাদের রাষ্ট্রপতি ভবনের দিকে পদযাত্রা করার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে শনিবার তারা কীভাবে সংগঠিত হবেন এবং কোথায় অবস্থান নেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এবার সাংবাদিকদের জন্যও বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে দিল্লি পুলিশ। সম্প্রতি দিল্লি পুলিশের বিরুদ্ধে নারী সাংবাদিককে যৌন হেনস্তার অভিযোগ ওঠার পর এবার দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ‘বডি ক্যামেরা’ লাগানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হলে ঘটনাস্থলে সংবাদ সংগ্রহ ও দৃশ্য ধারণের সময় সাংবাদিকদের নিরাপদ ও যুক্তিসংগত দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হয়েছে। তাদের এমন স্থানে অবস্থান করতে বলা হয়েছে, যেন সহজেই বিক্ষোভকারীদের থেকে আলাদা করে চেনা যায়।
রাজধানীতে আন্দোলনকারীদের প্রবেশ নিয়েও পুলিশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা সড়ক, রেল ও আকাশপথে দিল্লিতে আসতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার ধ্রুব রাঠি, অভিনেতা প্রকাশ রাজসহ আন্দোলনে প্রকাশ্য সমর্থন দেওয়া পরিচিত মুখগুলোও কখন এবং কোন পথে রাজধানীতে পৌঁছাবেন, সে বিষয়েও পুলিশের কাছে কোনো নিশ্চিত তথ্য নেই।
দিল্লি পুলিশের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আন্দোলনকারীরা বিমানবন্দর, রেলস্টেশন কিংবা বাস টার্মিনাল দিয়ে দিল্লিতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই তাদের আটকানোর চেষ্টা করা হবে।
তবে বিক্ষোভকারীরা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, তাদের যেখানেই বাধা দেওয়া হবে, সেখানেই তারা প্রতিবাদ শুরু করবেন।
এ পরিস্থিতিতে বিমানবন্দর, রেলস্টেশন ও বাস টার্মিনাল—তিন ধরনের প্রবেশপথেই সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সেস সদস্যদের মোতায়েনের সম্ভাবনা রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের আরেক কর্মকর্তা হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, ‘আপাতত শুধু নয়াদিল্লিতে গণ জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শনিবারের পরিস্থিতি অনুযায়ী বিমানবন্দর কিংবা রেলস্টেশনের বাইরেও চারজনের বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করার আদেশ জারি হতে পারে।’
এরইমধ্যে নয়াদিল্লির বিভিন্ন স্থানে নজরদারি ক্যামেরা ও মাইক বসিয়েছে পুলিশ। এসব মাইকে সাধারণ মানুষকে বিক্ষোভে অংশ না নিতে এবং বড় জমায়েত এড়িয়ে চলতে বলা হচ্ছে।
এবারের বিক্ষোভে নিরাপত্তার আরেকটি জটিল দিক হলো, আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার পাশাপাশি আন্দোলনে যোগ না দেওয়া অন্যরাও সর্বোচ্চ নিরাপত্তাঝুঁকিতে রয়েছেন এবং তাদেরও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সেন্ট্রাল আর্মড পুলিশ ফোর্সেসের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তার নিয়ম অনুযায়ী, আটক অবস্থায় তাদের যে বাসে নেওয়া হবে, সেই বাসে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদেরও থাকতে হবে। গত কয়েক দিনে বিরোধী নেতা রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে আটকের ছবিগুলো ভালোভাবে দেখলে বাসের ভেতরে তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তাদেরও দেখতে পাবেন। মূলত তারা যেন পুলিশের হাতে কিংবা ভিড়ের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত না হন সেটি নিশ্চিত করা হয়েছে।’
বিক্ষোভের কারণে রাজধানীজুড়ে মদের দোকান বন্ধ রাখার মতো ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। বৃহস্পতিবার দিল্লির আবগারি বিভাগ পরবর্তী দুই দিনের জন্য পুরো শহরের সব মদের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। আবগারি বিভাগের উপকমিশনার জানিয়েছেন, দিল্লি পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘নির্বাচনের সময় মদের দোকান বন্ধ রাখা সাধারণ ঘটনা। তবে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে পুরো শহরে মদের দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ এই প্রথম। আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে, এমন চ্যালেঞ্জিং সময়ে কিছু দুষ্কৃতকারী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করার চেষ্টা করতে পারে।’


