দিল্লির রাজপথে পুলিশের কাঁটাতারের ব্যারিকেডে উঠে স্লোগান দিচ্ছেন চোখে চশমা পরা এক তরুণী। কখনো পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি, কখনো মাইক হাতে আগুনঝরা বক্তৃতা, আবার কখনো দাবি আদায়ে রাজপথে অনশনে বসে যাওয়া–চলমান ভারতের ছাত্র আন্দোলনের খবর মানেই যেন এই চেনা দৃশ্য আর চেনা মুখ। তিনি নেহা বোরা।
ভারতে প্রশ্ন ফাঁস, জালিয়াতি ও নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের লড়াইয়ে ২৯ বছর বয়সী এই তরুণী এখন আন্দোলনের প্রধান মুখ। তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) পিএইচডির শিক্ষার্থী। এর পাশাপাশি তিনি সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের ছাত্রসংগঠন ‘এআইএসএ’-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি।
গত জুন ও জুলাইয়ে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ব্যানারে প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধ ও তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন উত্তাল হয়ে ওঠে। দিল্লির যন্তর মন্তরে যে ছয়জন আমরণ অনশনে বসেছিলেন, নেহা ছিলেন তাঁদের অন্যতম। গত ২৫ জুলাই আন্দোলনের চাপে শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করলে উল্লাসের ভিডিও শেয়ার করে নেহা লিখেছিলেন, ‘আমি যদি নাচতে না পারি, তবে তা আমার বিপ্লব নয়।’
উত্তরাখন্ডের খাটিমার মেয়ে নেহা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং বি আর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পারফরম্যান্স স্টাডিজে স্নাতকোত্তর শেষ করেন। বর্তমানে তিনি জেএনইউর ‘স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড অ্যাস্থেটিকস’-এ থিয়েটার ও পারফরম্যান্স বিষয়ে ডক্টরেট করছেন।
টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নেহা জানান, থিয়েটার চর্চাই তার রাজনৈতিক ও সামাজিক বোধকে শাণিত করেছে। ২০১৯ সালে বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে রাজপথের বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর এই লড়াই শুরু হয়।
যন্তর মন্তরে টানা ২৩ দিন অনশনে থাকার ফলে নেহার ওজন প্রায় সাড়ে সাত কেজি কমে যায় এবং রক্তের শর্করার মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে নেমে আসে। চিকিৎসকরা প্রাণের ঝুঁকির আশঙ্কায় অনশন ভাঙার পরামর্শ দিলেও তিনি থামেননি।
অনশনকালে সামাজিকমাধ্যমে তার সক্রিয় উপস্থিতি নজর কাড়ে। পেটের ক্ষুধার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদি সরকারের ‘ক্ষমতার ক্ষুধা’র তুলনা টেনে করা তাঁর ব্যঙ্গাত্মক পোস্টগুলো নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে পড়ে।
নেহার বাবা সাবেক সেনা কর্মকর্তা এবং মা গৃহিণী–পরিবারটি কটর বিজেপি সমর্থক হওয়ায় তার বাম রাজনীতি মানতে পারেনি। তবে অনশনে মেয়ের শারীরিক অবনতির খবর পেয়ে উত্তর প্রদেশের বেরেলি থেকে ৩০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যন্তর মন্তরে ছুটে আসেন তার মা।
গত ২০ জুলাই মিছিল আটকে দিলে পুলিশের উদ্দেশে নেহা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, ‘শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ওপর চালানো প্রতিটি আঘাত এই অহংকারী সরকারের পতনের কারণ হবে।’
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের পর কপিল সিবালের ইউটিউব শো ‘দিল সে’তে এসে তিনি বলেন, ‘কারও পদত্যাগই শেষ কথা নয়; সমস্যা পুরো ব্যবস্থার ঔদ্ধত্যের। সাধারণ মানুষকে বারবার ব্যর্থ করার এই শাসনপদ্ধতি চলতে পারে না।’
পরবর্তীতে এআইএসএ-এর মাধ্যমে ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) ও ২০২০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে কাজ করার পর আগস্টে দেশজুড়ে ‘জেন-জি রাইজিং’ কর্মসূচি শুরু করেন নেহা।
গত ৭ আগস্ট ঝাড়খণ্ডের রাঁচিতে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (জেপিএসসি) ও স্টাফ সিলেকশন কমিশনের (জেএসএসসি) দুর্নীতির বিরুদ্ধে মিছিলকালে এক ব্যক্তি সোজা নেহার মুখে কালি ছুড়ে মারে। আটক ব্যক্তি দাবি করে, জেএনইউর সাবেক শিক্ষার্থী উমর খালিদের পক্ষে কথা বলাতেই সে এই কাজ করেছে। কিন্তু মুখভর্তি কালির ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর নেহা সাফ জানিয়ে দেন, শিক্ষার্থীদের জন্য লড়তে গিয়ে পাওয়া এই কালি তিনি গর্বের সঙ্গেই মেখে রাখবেন।
সর্বশেষ ২৫ সেপ্টেম্বর নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ‘বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন’ (এসআইআর) প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করার সময় দিল্লি পুলিশের হাতে আটক হন নেহাসহ ৬০ জনের বেশি আন্দোলনকারী। পরে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। সব বাধা ঠেলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের এই লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন এই তরুণী।


