ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুতিদের হামলার মুখে সৌদি আরবে দ্রুত সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে পাকিস্তান।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সবশেষ ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক অভিযানে অংশ না নেওয়ার পক্ষে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট ভোট দিয়েছিল। সেই ঘটনার ১১ বছর পর এবার কোনো সংসদীয় ভোট ছাড়াই সৌদি আরবে দ্রুত আরও সেনা পাঠাতে সম্মত হয়েছে ইসলামাবাদ। এ সিদ্ধান্তে পাক সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের অধীনে দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে সেনাবাহিনীর শক্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে।
তবে সেনা মোতায়েনের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে পাকিস্তনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, এটি ‘সামরিক কার্যক্রমের গোপনীয়তার বিষয়’।
সৌদি আরবে পাঠানো পাকিস্তানি সেনারা হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক অভিযানে অংশ নেবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, হুতিরা ইরানের সমর্থনপুষ্ট হওয়ায় পাকিস্তানের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তান এখনো তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে। এ অবস্থায় পাকিস্তান সরাসরি হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে ইরানের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক ভেঙে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
গত আগস্টে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সই হওয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি (মক্কা চুক্তি) গত সোমবার প্রথমবারের মতো কার্যকর করা হয়েছে। এর অধীনে সৌদি আরবে হুথি হামলা ঠেকাতে এবং ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে হুথি বিরোধী অভিযানে সামরিক সহায়তা দিতে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবে নতুন করে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সামরিক বাহিনীর ক্রমবর্ধমান ক্ষমতারই প্রতিফলন।
গত বছর পাকিস্তানের সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত দেশটির তিন বাহিনীর সর্বাধিনায়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে আজীবনের জন্য ফিল্ড মার্শাল পদমর্যাদা এবং ফৌজদারি মামলা থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে। সে পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করছেন আসিম মুনির।
সম্প্রতি দেশটির কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের কর্মী-সমর্থকেরা ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রা করেন। তাদের অভিযোগ, পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক আবাসিক জ্যেষ্ঠ গবেষক মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ‘আগে এমন সময় ছিল, যখন পাকিস্তানের পার্লামেন্ট সেনা না পাঠানোর পক্ষে ভোট দিত এবং সামরিক বাহিনী সেই সিদ্ধান্ত মেনে চলত। কিন্তু এখন পরিস্থিতি ভিন্ন।’
এদিকে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সৌদি আরবের সঙ্গে সামরিক জোট গঠনের ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। তবে এ সিদ্ধান্তে মন্ত্রিসভা কিংবা পার্লামেন্টের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয় কিছু জানায়নি।
গত জুলাইয়ে লোহিত সাগরে সৌদি আরবের জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে হুতিরা। এরপর থেকে তারা সৌদি সংশ্লিষ্ট তেলবাহী জাহাজ ও দেশটির তেল স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আসছে।
গত সপ্তাহে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট অভিযোগ করে, হুতিরা মদিনার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। ওই কেন্দ্র থেকে মসজিদে নববীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। তবে হুতিরা এ হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ম ও নিরাপত্তা রক্ষায় দেশটির রাজধানী রিয়াদে একটি জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সৌদি আরব ও তুরস্কের সামরিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরও অংশ নেন।
ওই বৈঠকের পর তিন দেশ মক্কা ও মদিনায় হামলার চেষ্টার নিন্দা জানায়। একই সঙ্গে তারা নিজ নিজ দেশের জাতীয় আইন অনুযায়ী ‘সামরিক সক্ষমতাসহ সেনা দ্রুত মোতায়েন নিশ্চিত করার’ ঘোষণা দেয়।
তবে তিন দেশ কতসংখ্যক সেনা পাঠাবে, তাদের দায়িত্ব কী হবে, কার নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হবে, এতে কত খরচ হবে কিংবা কত দিন সেনা মোতায়েন থাকবে—এসব বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
২০১৫ সালে সৌদি সরকারকে সামরিক সহায়তা দেয়নি পাকিস্তান
এর আগে ২০১৫ সালেও ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালানোর জন্য পাকিস্তানের কাছে সেনা, যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ চেয়েছিল সৌদি আরব।
তৎকালীন পাকিস্তান সরকার বিষয়টি পার্লামেন্টে উত্থাপন করে। পরে পার্লামেন্ট সর্বসম্মতিক্রমে ইয়েমেনের সংঘাতে নিরপেক্ষ থাকার প্রস্তাব গ্রহণ করে। তবে সেসময় সৌদি আরবের ভূখণ্ড ও ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য পবিত্র স্থানগুলো রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৫ সালের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মূল পার্থক্য রাজনৈতিক।
২০১৫ সালেও পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনার ক্ষমতা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে ছিল। এখনো সেই সাংবিধানিক বিধান বহাল রয়েছে। তবে পাকিস্তানে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে সেনাবাহিনীই কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে।
দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আসিম মুনির তার পূর্বসূরি যেকোনো সেনাপ্রধানের তুলনায় বেশি ক্ষমতাশালী বলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
সৌদি আরবে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নেওয়াজ এবং তাদের মিত্র পাকিস্তান পিপলস পার্টি কোনো মন্তব্য করেনি। এ বিষয়ে ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের মুখপাত্র জুলফি বুখারিও দলের সমর্থন রয়েছে কি না, তা স্পষ্ট করেননি।
তবে তিনি বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হওয়া উচিত এবং ‘রাজনৈতিক প্রজ্ঞার’ ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।


