চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরুর পর থেকেই একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। গত পৌনে তিন বছরে এ রুটে ট্রেন দুর্ঘটনায় অন্তত ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া একটি হাতিও মারা গেছে। শুধু চলতি সেপ্টেম্বর মাসেই অন্তত পাঁচজন প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় ফখরুদ্দিন বাবলু নামে সাবেক এক ছাত্রলীগ নেতা নিহত হন।
রেলওয়ে ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এসব দুর্ঘটনার বড় অংশই ঘটেছে অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিং এবং অনিরাপদ রেলপথ পারাপারের কারণে। ১৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের পাশাপাশি রয়েছে বিপুলসংখ্যক অবৈধ ক্রসিং।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের তথ্যমতে, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথে বৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে ৯৯টি। এর বিপরীতে অবৈধ ক্রসিং রয়েছে ৭৭টি। বৈধ ক্রসিংগুলোর মধ্যে ৫৬টিতেই কোনো গেটম্যান নেই। ফলে এসব স্থানে ট্রেন চলাচলের সময় যানবাহন ও পথচারীদের নিরাপত্তা অনেকটাই নির্ভর করছে চালক ও পথচারীদের নিজস্ব সতর্কতার ওপর।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনা কমাতে ইতোমধ্যে ২২টি অবৈধ লেভেল ক্রসিং বন্ধ করা হয়েছে। আরও ৩৫টি বন্ধের প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে গেটম্যানবিহীন ৫৬টি বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে গেটম্যান নিয়োগের প্রস্তাব রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তবে নতুন নির্মিত রেলপথের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় জনবলের তুলনায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথের মোট দৈর্ঘ্য ১৫২ কিলোমিটার। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী পর্যন্ত পুরোনো রেললাইন ৪৭ কিলোমিটার এবং দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত নতুন রেললাইন প্রায় ১০১ কিলোমিটার।
রেলওয়ের হিসাবে, চট্টগ্রাম-দোহাজারী অংশে বৈধ লেভেল ক্রসিং রয়েছে ২৭টি। এর বিপরীতে অবৈধ ক্রসিং রয়েছে ৪৭টি। দোহাজারী-কক্সবাজার অংশে বৈধ ক্রসিং ৭২টি এবং অবৈধ ক্রসিং ৩০টি।
নিরাপত্তার ঘাটতি সবচেয়ে বেশি দোহাজারী-কক্সবাজার অংশে। নতুন নির্মিত এই অংশের ৭২টি বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ৫৬টিতেই নেই গেটম্যান। এসব স্থানে ট্রেন আসা-যাওয়ার সময় যানবাহন ও পথচারীদের প্রবেশ ঠেকানোর জন্য কোনো ব্যারিয়ারও নেই। ফলে দ্রুতগতির ট্রেন চলাচল করা এই রুটে লেভেল ক্রসিংগুলোতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুজন কান্তি দে জানান, ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ২৭ জন, ২০২৫ সালে ৪৩ জন এবং চলতি বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি হাতিও মারা যায়।
এদিকে চট্টগ্রাম রেলওয়ে থানার হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ ও চট্টগ্রামের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য রেলপথে ২০২৪ সাল থেকে চলতি বছরের ১ অক্টোবর পর্যন্ত ট্রেন দুর্ঘটনায় মোট ১৯১ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালে ৫৭ জন, ২০২৫ সালে ৮১ জন এবং ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৩ জন ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান।
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু হয় ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর। বর্তমানে এ রুটে চার জোড়া ট্রেন চলাচল করছে।
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে আন্তনগর কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও পর্যটক এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে প্রবাল এক্সপ্রেস ও সৈকত এক্সপ্রেস চলাচল করছে। আগামী মাসে এ রুটে ঢাকা পর্যন্ত মহানগর এক্সপ্রেস যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে ট্রেনের সংখ্যা বাড়লে অনিরাপদ লেভেল ক্রসিং ও রেলপথ পারাপারের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, বিভিন্ন সংস্থা ও স্থানীয় লোকজন নিজেদের চলাচলের সুবিধার জন্য রেললাইনের ওপর দিয়ে অবৈধ পথ তৈরি করছেন। এসব পথে চলাচলের সময় সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
চট্টগ্রাম রেলওয়ে পুলিশ সুপার (এসপি) তহুরা জান্নাত বলেন, অধিকাংশ লেভেল ক্রসিং অবৈধ। মানুষ নিজেদের সুবিধার জন্য এসব ক্রসিং তৈরি করছেন। দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে আবার তারাই রেললাইন অবরোধ করে সেখানে গার্ড বা নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগের দাবি করছেন।


