রাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের ‘ডামি প্যানেল’ হিসেবে আলোচিত হওয়া ‘আধিপত্যবিরোধী ঐক্য’ প্যানেল থেকে জিএস নির্বাচিত হওয়া সালাউদ্দিন আম্মার এক বছর আগেই রাবি শিবিরের সাথীপদ থেকে বহিষ্কার হয়েছেন।
গতকাল বুধবার শাখা শিবিরের প্যাডে বহিষ্কার সংক্রান্ত তিনটি চিঠি ছড়িয়ে পড়লে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হাফেজ মেহেদী হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
চিঠি তিনটিতে বহিষ্কারের কারণ হিসেবে নৈতিক পদস্খলন, মৌলিক ইবাদত পালনে উদাসীনতা, মেয়েদের সঙ্গে অবাধ বিচরণ, অবৈধ অর্থনৈতিক লেনদেন ও সম্পদের তছরুপ এবং সংগঠনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া আম্মারের কর্মকাণ্ড এবং ‘ক্ষেত্রবিশেষে ফৌজদারি অপরাধে জড়িত হওয়ার’ কারণে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে বলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে উল্লেখ করা হয়।
বুধবার রাতে এক ফেসবুক পোস্টে শিবিরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সালাউদ্দিন আম্মার বলেন, ‘আমি তাদের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। তবে বর্তমানে আনা অভিযোগগুলোর সঙ্গে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’
আম্মার আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের পক্ষে শিবির কোনো প্রমাণ দেয়নি। তিনি অভিযোগগুলো প্রমাণের জন্য শিবিরকে চ্যালেঞ্জও জানান।
সাথীপদ থেকে সরানোর বিষয়টি সামনে আসার পর আম্মারের বিরুদ্ধে গত দুই বছরে ওঠা অভিযোগগুলো ফের আলোচনায় এল। সেক্ষেত্রে অন্য ছাত্রসংগঠনগুলোর দাবি শিবির এতদিন সংগঠনের পরিচয়ে যেসব কাজ করতে পারেনি তা আম্মারকে দিয়ে করানো হয়েছে। আম্মারকে বহিষ্কারের ঘটনাকে শিবিরের কৌশল হিসেবেও দেখছেন কেউ কেউ।
ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতারা বলেন, আম্মারকে ঘিরে শিবিরের সাম্প্রতিক অবস্থানকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। নিজেদের দায় এড়াতে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করতেই এমন কৌশল নিয়েছে শিবির।
শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ‘ডোমদের নাকি দুর্গন্ধ নাকে না গেলে খাবার হজম হয় না, একইভাবে ছাত্রশিবিরের নোংরামি ছাড়া সুস্থ ধারার রাজনীতি কখনোই পছন্দ না। আর এ কারণেই তারা বারবার রাজনীতির নামে এমন নোংরামি করে।’
শাখা ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি মেহেদী মারুফ বলেন, আম্মারকে বহিষ্কারের বিষয়টি লোক দেখানো। আমরা বারবারই বলে এসেছি, আম্মার শিবিরেরই অংশ। অফিসিয়ালি শিবির যে কাজগুলো করতে পারে না, আম্মার সেগুলোই করেন। তাকে বহিষ্কারের ঘটনাটিও নেহাতই শিবিরের আরেকটি অপকৌশল।
মব, হামলা ও চাঁদাবাজির অভিযোগ
রাকসু নির্বাচনের আগে থেকেই নানা ঘটনায় আলোচনায় ছিলেন রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার। জুলাই আন্দোলনে স্লোগান দিয়ে সামনে আসা আম্মার জুলাইয়ের পর একেক পর এক সমালোচিত কার্যক্রম করে আলোচনায় ছিলেন।
আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রলীগ ধরে পেটানো দিয়ে শুরু করা আম্মার থামেননি কোথাও। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে মব, চাঁদাবাজিসহ আলোচিত সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী মাসুদ হত্যাকাণ্ডে ছিলেন সন্দেহভাজন।
সর্বশেষ গত ২০ সেপ্টেম্বর রাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে রাবির এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে আরএনবি কর্তৃক হামলার অভিযোগ উঠলে শিক্ষার্থীদের নিয়ে স্টেশনে ভাঙচুর করেন আম্মার। তবে আম্মারের দাবি, ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্যই তিনি অবস্থান নিয়েছিলেন।
গত ২৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরিতে এক শিক্ষার্থীকে ‘ছাত্রলীগ’ আখ্যা দিয়ে হামলার নেতৃত্ব দেন আম্মার। ওই ঘটনায় বেলচা হাতে ওই শিক্ষার্থীকে হুমকি দেওয়ার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করে। তবে তদন্ত প্রতিবেদন এখনো জমা হয়নি।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর রাবি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মচারী আবদুল্লাহ আল মাসুদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায়ও আম্মারের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে ঘটনাটি তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তবে আম্মারের দাবি তিনি আরেকটি ধর্ষণ ঘটনার মামলা দেখতে বোয়ালিয়া থানায় থাকায় তাকে সেই ঘটনায় জড়ানো হয়। ছাত্রলীগ তাদের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এই মামলার সঙ্গে জড়ানো হয় বলেও দাবি তার।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক জালাল উদ্দিন বলেন, তদন্ত চলমান থাকায় বিষয়টি এখনো অত্যন্ত গোপনীয়। শুধু বলতে পারি, আমাদের তদন্ত চলছে।
এর আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই ৩৬, মুক্তির উৎসব’ কনসার্ট আয়োজনের জন্য ৭০টি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭৬ লাখ টাকা চেয়ে চিঠি পাঠানোর ঘটনাতেও আম্মারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে এটিকে একটি প্রস্তাবপত্র বলে দাবি করেন।
পোষ্য কোটা আন্দোলন ঘিরেও আম্মারের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপউপাচার্য (প্রশাসন) মাঈন উদ্দিনের বাসভবন ঘেরাও, তার গাড়িতে টাকা ছুড়ে মারা ও শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ ওঠে। একই সময়ে উপাচার্য, উপউপাচার্যসহ শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করে রাখার আন্দোলনেও তিনি নেতৃত্ব দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় অনুষদের আওয়ামী লীগপন্থী ডিনদের মব সৃষ্টি করে পদত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন রাবি জিয়া পরিষদের সভাপতি নেছার উদ্দিনের টাঙানো ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।


