ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের গেটে শিক্ষার্থীদের প্রস্তাবিত ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামফলকটি মুছে ফেলা হয়। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে রং দিয়ে হলের গেটে তার নামে নামফলক আঁকা হয়েছিল।
তবে সবশেষ সিনেটে হলের নাম পরিবর্তনের দাবিটি পাশ না হওয়ায় বুধবার দুপুর ২টার দিকে হলের গেট থেকে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামফলকটি মুছে ফেলা হয়।
ওসমান হাদির নামফলক মুছে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ছাত্রদল কিংবা শিবির কারও নয় উল্লেখ করে শেখ মুজিবুর রহমান হলের সাধারণ সম্পাদক আল সাবাহ টাইমসকে বলেন, ‘বহুদিন হলের গেটে নামফলক না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে হল প্রশাসন আবেদন করেছিল-তারা স্টিলের নাম ফলক লাগাবে। এই কাজের জন্য তারা বাজেট চেয়েছিল এবং সেটা পাস হয়ে গেছে। তাই তারা এখন রং দিয়ে লেখা আগের নামটা মুছে ফেলেছে। আমরা মনে করি যারা চায়নি ওসমান হাদি ঢাবিতে কবরস্থ হোক তারাই মূলত প্রশাসনে এসেছে। তো তারা চায় না এই নামে একটা হল হোক। আমরা এটা নিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা সিনেটের মূল আলোচ্য বিষয় থেকে সেটাকে প্রত্যাহার করে পুনরায় সিন্ডিকেটে পাঠিয়েছেন। তবে এটা সত্য, ব্যাপারটা এখনো ঝুলেই আছে। তারা এখনো ওই দাবিটাকে পুরোপুরি খারিজ করে নাই। আমরা হলের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে স্বাক্ষর সংগ্রহ করেছি এবং তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই হলের নাম পরিবর্তনের পক্ষে ভোট দিয়েছে।’
অন্যদিকে প্রো-ভিসি মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী টাইমসকে বলেন, ‘হল প্রশাসন ছাত্রদের সঙ্গে মতবিনিময় করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেহেতু নাম পরিবর্তন হয় নাই সেহেতু যে নামটা লেখা আছে সেটা রাখা যাবে না। হল প্রভোস্ট (প্রাধক্ষ্য) এমন তথ্যই জানিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘সবশেষ সিনেটে এই নাম পরিবর্তনের যে প্রস্তাব এসেছিল সেটা গ্রহণ করা হয়নি। সেহেতু নিয়ম অনুযায়ী আগের নামটা বহাল থাকবে।’
তার বক্তব্য অনুযায়ী, নামফলকে শেখ মুজিবুর রহমান হল লেখা হবে কিনা- প্রশ্নের জবাবে আলফেছানী বলেন, ‘এখন হল প্রশাসন ছাত্রদের সঙ্গে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই সিদ্ধান্তের আলোকে ব্যবস্থা নেবে। তারা কি বাস্তবায়ন করে সেটা আমরা পর্যবেক্ষণ করছি।’
এ বিষয়ে প্রক্টর ইসরাফিল রতন টাইমসকে বলেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম কাগজপত্রে যা আছে সেটা তো আর বদল হয়নি। তবে ছাত্রদের আকাঙ্ক্ষার তীব্রতা নষ্ট করা হচ্ছে না।’
নতুন নামফলকে শেখ মুজিবুর রহমান হল লেখা হবে নাকি সে প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলেছি, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত প্রশাসন নেয়নি।’
এর পরিপ্রেক্ষিতে বুধবার রাতে প্রেস ব্রিফিংয়ে কয়েকটি দাবি ও প্রশ্ন রাখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)। সংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, হলের নামের কারণে শিক্ষার্থীদের নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের সঙ্গে জড়িয়ে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে। তাই নিরাপত্তার স্বার্থেই অধিকাংশ শিক্ষার্থীর গণস্বাক্ষরের ভিত্তিতে হলটির নাম পরিবর্তন দরকার।
তারা জানান, প্রশাসন শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ করার সুপারিশ জানালেও বিষয়টি সিনেট ও সিন্ডিকেটের মধ্যে ঝুলে থাকে এবং সিনেটে প্রতিনিধিরা সভা থেকে ওয়াকআউট করেন। শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নাম পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কারণ জানতে চান ডাকসু নেতারা।
ডাকসুর পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘বিপুল অর্থ ব্যয় করে এখানে ফ্যাসিবাদের আইকনের নামে স্টিলের দামি নামফলক বসানো হবে; এটি অনেক টাকার ব্যাপার এবং এর জন্য বিপুল অংকের বাজেট করা হয়েছে বলে গুঞ্জন উঠেছে।’ এই টাকা লীগ থেকে ফান্ডিং করেছে কি না শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই প্রশ্নও উঠেছে বলে দাবি করা হয় প্রেস ব্রিফিংয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনটির দাবি, বিএনপির ক্ষমতার ছয় মাস পার হলেও জিয়া হলে নান্দনিক গেট নির্মাণ না করে, ফ্যাসিবাদী আইকনের নামে হলে বিপুল খরচে নামফলক পুনঃস্থাপনের অপচেষ্টা বিএনপি সরকার ও বিএনপি-নিয়ন্ত্রিত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো ব্যাকডোর লিয়াজোঁ ও দূরভিসন্ধির বহিঃপ্রকাশ।
শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী ফাহাদ হুসাইন বলেন, ‘আমার হলের নাম ফ্যাসিবাদের প্রতীকের নামে চাই না। এইটার দোষ শেখ হাসিনার আর মুজিবের করা বাকশালকে দেন, দুর্ভিক্ষকে দেন, অন্য কাউকে না। হলের নাম এমএজি ওসমানী দেন, কাজী নজরুল দেন, বীরশ্রেষ্ঠ যেকোনো একজনের নামে দেন, ৯০ এর নূরের নামে দেন, ২৪ এর আবু সাঈদের নামে দেন, অন্য যেকোনো কিছু দেন। দরকার পড়লে খালেদা জিয়ার নামে হল দেন। আমার কোনো সমস্যা নাই। শেখ মুজিবের নাম আর না।’
চলতি বছরের ২৯ জুন রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক সিনেট সভায় ওয়াকআউট ঘটে, যখন উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম প্রস্তাবটি পুনরায় সিন্ডিকেটে পাঠানোর ঘোষণা দেন। এর প্রতিবাদে ছাত্র প্রতিনিধিরা অধিবেশন ত্যাগ করেন।
ওয়াকআউট করা পাঁচ প্রতিনিধি হলেন—ডাকসু সহ-সভাপতি (ভিপি) সাদিক কায়েম, সাধারণ সম্পাদক (জিএস) এস এম ফারহাদ, সহকারী সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) মুহাম্মদ মহিউদ্দিন, পরিবহন সম্পাদক আসিফ আবদুল্লাহ এবং সদস্য সাবিকুন্নাহার তামান্না।
এর আগে, হল সংসদের নেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের নাম পরিবর্তন করে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ করার দাবি জানিয়েছিলেন। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর রাত আড়াইটার দিকে তারা হল গেটে ‘শহীদ ওসমান হাদী হল’ লেখা একটি ব্যানার ঝুলিয়ে দেন।


