সাংবাদিকতার অস্তিত্ব সংকট ও সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরে একজোট হয়েছে বিশ্বের এক হাজারের বেশি সংবাদপ্রতিষ্ঠান। সোমবার বিশ্ব সংবাদ দিবসে (ওয়ার্ল্ড নিউজ ডে) নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতার প্রকৃত মূল্য তুলে ধরতে সম্পাদকীয়, বিজ্ঞাপন এবং কার্টুন প্রকাশ ও প্রচার করছে নিউইয়র্ক টাইমস, রয়টার্স, কিয়েভ ইন্ডিপেনডেন্টসহ বিশ্বজুড়ে আলোচিত সংবাদমাধ্যমগুলো।
রয়টার্স ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে সংবাদের প্রতি মানুষের আস্থা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এতে বলা হয়েছে, মানুষ ক্রমেই সংবাদ পাওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবটের দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্ব সংবাদ দিবসের সহ-আয়োজক ব্রাঙ্কো ব্রকিচ বলেন, ‘একসময় যারা ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী, সেই সংবাদমাধ্যমগুলোকেও এখন একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা যদি খেলার নিয়ম না বদলাই, তাহলে আমরা টিকেই থাকতে পারব না।’
বিবিসির খবরে বলা হয়, ২০১৮ সালে বিশ্বজুড়ে প্রথমবারের মতো উদযাপিত হয় বিশ্ব সংবাদ দিবস। এরপর থেকে বিশ্ব সংবাদ দিবসের পরিসর বেড়েছে। ‘নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকতা গুরুত্বপূর্ণ’- এই বার্তার মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো অনুসন্ধান, ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা তুলে ধরাই এই দিবসের লক্ষ্য।
সম্প্রতি রয়টার্স ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদনে জনসাধারণের মধ্যে সংবাদের প্রতি ‘উদ্বেগ, অনাগ্রহ ও নৈরাশ্যবাদ’ থাকার কথা বলা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে নতুন উৎস ও নতুন উপস্থাপনার প্রতি উন্মুক্ততা এবং ভালো সাংবাদিকতা কী দিতে পারে, সে বিষয়ে মানুষের আস্থা এখনো রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়েছে, গত বছর অনলাইনে সংবাদ পাওয়ার প্রধান উৎস হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিওভিত্তিক নেটওয়ার্কগুলো (টেলিভিশন, ইউটিউব ইত্যাদি) সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে এসব উৎসের প্রতি মানুষের আস্থা তুলনামূলকভাবে কম।
এ মাসের শুরুতে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক অফকম জানায়, মানুষ এখন আরও বৈচিত্র্যময় উৎস থেকে সংবাদ সংগ্রহ করছে। ইউটিউব দ্রুত জনপ্রিয়তা বাড়াচ্ছে এবং ২০ শতাংশ মানুষ সংবাদ জানার জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
তবে অফকমের মতে, পছন্দের পরিসর বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাকে এবং কোন তথ্যকে বিশ্বাস করা উচিত—এ নিয়ে অনিশ্চয়তাও বেড়েছে। তা সত্ত্বেও প্রচলিত সংবাদমাধ্যমগুলোকে এখনো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর তুলনায় বেশি নির্ভরযোগ্য, বেশি সঠিক এবং বেশি নিরপেক্ষ বলে মনে করা হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার ডেইলি মাভেরিকের প্রতিষ্ঠাতা ব্রাঙ্কো ব্রকিচ স্বীকার করেন, গণমাধ্যমের পরিবেশ বদলে গেছে এবং প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যমগুলোকেও তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, ‘সেই পুরোনো দিন আর ফিরে আসছে না। আমাদের নতুন এক ভারসাম্য গড়ে তুলতে হবে, আর তা সম্ভব কেবল তখনই, যখন আমরা সত্যিই একসঙ্গে কাজ করব।’
‘আমরা যদি এভাবে চলতে থাকি, তাহলে আমরা কেবল দুর্বল, বিচ্ছিন্ন খেলোয়াড় হয়ে থাকব, যাদের একে একে সরিয়ে দেওয়া হবে। আমরা যদি মৌলিকভাবে এবং জরুরিভাবে কিছু না বদলাই, তাহলে আমরা রাস্তার ধারে পড়ে থাকা পিষ্ট দেহে পরিণত হব। মূলধারার গণমাধ্যম “ভুল করেছে”, কিন্তু পেশাদার ও নির্ভরযোগ্য সাংবাদিকদের সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে’, যোগ করেন তিনি।
ব্রকিচ বলেন, ‘আমাদের পাঠক-দর্শকদের সঙ্গে কথা বলতে হবে এবং বুঝিয়ে বলতে হবে—সত্য ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে বেছে নিতে হবে, তাদের নিজেদের স্বার্থেই। সত্য এবং তথ্য ছাড়া আমরা চলতে পারি না।’
তবে সংবাদে ‘সত্য’ বলতে কী বোঝায়, তা অনেক সময়ই বিতর্কিত হয়ে ওঠে। উদাহরণ স্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যমবিরোধী অবস্থানের কথা বলা হয়েছে। তিনি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে ‘ভুয়া সংবাদমাধ্যম’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ব্রকিচ বলেন, ‘এটি তথ্যভিত্তিক সমাজ। আমরা সেই তথ্যভিত্তিক সমাজের অবকাঠামো। আর আমাদের ছাড়া সেই সমাজ সত্যিই বড় ধরনের সংকটে পড়বে।’


