ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা মাত্র ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ে দখলে নিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনীর বিরুদ্ধে এই অভিযানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) উপদেষ্টারা সরাসরি মাঠে থেকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
হুথিদের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, দুই আঞ্চলিক কর্মকর্তা, ইয়েমেনের একজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার এবং দেশটির প্রেসিডেন্সিয়াল কাউন্সিলের একজন সদস্যের বরাতে একথা জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এপি। ২০১৪ সালে ইয়েমেনে গৃহযুদ্ধ শুরুর পর থেকে হুথিদের পক্ষে ইরানের সর্বোচ্চ সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে এটিকে।
প্রায় ১১৫ কিলোমিটার এলাকায় দ্রুত অগ্রসর হয়ে হুথিরা উপকূলীয় অঞ্চলে বড় ধরনের ভূখণ্ড দখল করেছে। সরকারপন্থী বাহিনীগুলোর অভ্যন্তরীণ বিভাজনকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি তাদের একটি প্রধান বাহিনী ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের যোগাযোগব্যবস্থায় প্রবেশ করে হুথিরা। এতে তারা ওই বাহিনীর গতিবিধি সম্পর্কে জানতে এবং বিভ্রান্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়।
৯ সেপ্টেম্বর হুথিরা পাহাড়ি একটি সরু উপত্যকা দিয়ে দক্ষিণ দিকে মোখা শহরের দিকে অগ্রসর হয়ে ব্যাপক গোলাবর্ষণ করে। যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের কমান্ডাররা কয়েকটি ফ্রন্টের সঙ্গে যোগাযোগ হারান। পরে হুথিরা গুরুত্বপূর্ণ একটি পাহাড়ি সড়ক ও সামরিক ঘাঁটি দখল করে মোখায় সরকারপন্থী বাহিনীর সরবরাহপথ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের নেতা লেফটেন্যান্ট জেনারেল তারিক সালেহ সৌদি আরবে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। ওই রাতেই মোখায় থাকা বাহিনীকে পিছু হটার নির্দেশ দেওয়া হয়। হাজার হাজার যোদ্ধা শহরে ঢুকতে শুরু করলে সেখানে থাকা সেনারা বড় ধরনের হুথি হামলা আসন্ন বলে ধারণা করে শহর ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। তাদের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক বাসিন্দাও শহর ছাড়েন।
মোখার এক বাসিন্দা ঈসা গুবওয়ানি বলেন, সামরিক যান ও পিকআপে করে যোদ্ধাদের শহর ছেড়ে যেতে দেখেছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘তারা আমাদের ভাগ্যের মুখে ছেড়ে গেছে।’
হুথিদের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ১০ সেপ্টেম্বর ভোরে বিদ্রোহীরা মোখায় প্রবেশের সময় শহরটি প্রায় জনশূন্য ছিল।
এই অভিযানে ইরানি উপদেষ্টাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো। হুথিদের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, আগে ইরানি উপদেষ্টারা মূলত কৌশলগত পরিকল্পনায় যুক্ত থাকলেও সাম্প্রতিক অভিযানে তারা ‘সব পর্যায়ে’ উপস্থিত ছিলেন। তারা কৌশলগত অভিযান পরিকল্পনা এবং সম্মুখসারির কমান্ডারদের সঙ্গে কাজ করেছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মাজেহেম আলসালুম বলেন, ইরানি উপদেষ্টারা হুথিদের কমান্ড কাঠামোয় সহযোগিতার পাশাপাশি যোগাযোগ ও স্যাটেলাইট গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণেও সহায়তা করেছেন।
তার মতে, এসব সক্ষমতা হুথিদের আগে সীমিত ছিল। গত বছর থেকে ইরান হুথিদের উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও চালকবিহীন হামলাকারী নৌযান ব্যবহারে প্রশিক্ষণ ও সরবরাহ বাড়িয়েছিল।
আলসালুম ও হুথিদের ওই কর্মকর্তা জানান, ইরানের একটি ফ্লাইট পরে ইয়েমেনে অবতরণ করে এবং এতে রেভল্যুশনারি গার্ডের উপদেষ্টারা ছিলেন। ইয়েমেনে আগে থেকেই অবস্থানরত ইরানি উপদেষ্টা এবং ইরানের মিত্র লেবাননের হিজবুল্লাহর উপদেষ্টাদের সঙ্গে তারা যোগ দেন।
এদিকে সরকারপন্থী বাহিনীগুলোর বিভাজন হুথিদের অগ্রযাত্রাকে সহজ করে দেয়। উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৩০ হাজার যোদ্ধা নিয়ে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী সরকারপন্থী বাহিনী। তবে ২০১৭ সালের পর তারা বড় কোনো যুদ্ধে অংশ নেয়নি।
ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের মুখপাত্র মেজর জেনারেল সাদিক দুয়াইদ বলেন, এক মাস ধরে হুথিরা তাদের অবস্থানে ১৩০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৪৫টি আত্মঘাতী ড্রোন হামলা চালায়। তার দাবি, ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের যোদ্ধারা প্রায় ১৭০ কিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে ছিল।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে আরেক সরকারপন্থী মিলিশিয়া জায়ান্টস ব্রিগেড তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসে এবং সাময়িকভাবে হুথিদের পিছু হটতে বাধ্য করে। তবে দুই বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ছিল। ইয়েমেনের এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাও ছিল। একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা বলেন, ‘ঐক্যবদ্ধ কমান্ড ছিল না’, আর এটিই হুথিদের জন্য বড় সুযোগ তৈরি করে।
মোখা দখলের পর হুথিরা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামও হাতে পেয়েছে। দুই সরকারি কর্মকর্তা জানান, এসবের মধ্যে সাঁজোয়া যান, রকেট, গোলাবারুদ ও কামান ছিল; যার বেশির ভাগই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরবরাহ করা। পরে এসব অস্ত্রের কিছু অংশ নিয়ে হুথিরা টেলিভিশনে সামরিক কুচকাওয়াজ করে।
ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স জানিয়েছে, সংঘর্ষে তাদের ৫০০ যোদ্ধা নিহত হয়েছেন। তবে এই সংখ্যা যাচাই করা যায়নি। হুথিরা তাদের নিজেদের হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
এদিকে সৌদি বিমানবাহিনী হুথিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে কেন হামলা চালায়নি, তা নিয়ে সরকারপন্থী বাহিনীর মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। ইয়েমেনি বাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, মোখা অভিমুখে হুথিদের অগ্রসর হওয়ার সময় সৌদি যুদ্ধবিমান হামলা না চালানোয় তারা বিস্মিত হয়েছেন।
বর্তমানে সরকারপন্থী বাহিনীগুলো পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। অন্যদিকে হুথিরা দখল করা এলাকাগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করছে বলে জানিয়েছেন হুথিদের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্সের জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ওয়ালিদ জিয়াদ বলেছেন, পশ্চিম উপকূল হারানো যুদ্ধের সমাপ্তি নয়; বরং আরও তীব্র লড়াইয়ের শুরু।


