সংবিধান সংশোধন হলে ভবিষ্যতে বাতিলের ঝুঁকি থাকে: শিশির মনির

সংবিধান সংশোধন হলে ভবিষ্যতে বাতিলের ঝুঁকি থাকে: শিশির মনির
আইনজীবী শিশির মনির। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেড় বছরের সৃষ্ট সাংবিধানিক শূন্যতার ব্যাখ্যা ও তা পূরণের ক্ষেত্রে শুধু দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংশোধনের পথে গেলে ভবিষ্যতে সেই সংশোধন আদালতে চ্যালেঞ্জ ও বাতিল হওয়ার আইনি ঝুঁকি রয়েছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

তিনি বলেন, ৫ আগস্ট থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের সাংবিধানিক ব্যবস্থার বৈধতা ব্যাখ্যা করতে হলে সাধারণ সংশোধনী ক্ষমতার বদলে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা বা কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার বিবেচনায় নিতে হবে।

সোমবার সুপ্রিম কোর্টের এনেক্স ভবনের সামনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, প্রচলিত নিয়মে সংশোধনের মাধ্যমে প্রিয়াম্বল পরিবর্তন করা যায় না, প্রস্তাবনা পরিবর্তন করা যায় না। সংশোধনের মাধ্যমে স্টেট পলিসি পরিবর্তন করা যায় না, সংশোধনের মাধ্যমে হাইকোর্টকে ঢাকার বাইরে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে না।

শিশির মনির বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো বা বেসিক স্ট্রাকচার সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায় না। তার যুক্তি, অতীতে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, ত্রয়োদশ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ সংশোধনী আনা হলেও পরবর্তী সময়ে এসব সংশোধনীর বিভিন্ন অংশ আদালতের রায়ে বাতিল বা অসাংবিধানিক ঘোষিত হয়েছে। তাই একই ধরনের আইনি ঝুঁকি এড়াতে সংবিধান সংস্কারের জন্য গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, শুধু সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে কোনো পরিবর্তন অনুমোদিত হলেই সেটি চূড়ান্ত সাংবিধানিক বৈধতা পেয়ে যায় না। কোনো সংশোধন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলে পরবর্তী সময়ে আদালতে তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

সংশোধনী ক্ষমতা নয়, গাঠনিক ক্ষমতা

শিশির মনির বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানে বেসিক স্ট্রাকচার ডকট্রিন বা মৌলিক কাঠামো তত্ত্বের স্বীকৃতি রয়েছে। তার ভাষায়, মৌলিক কাঠামো প্রচলিত পদ্ধতিতে সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায় না। ফলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রশ্নে সাধারণ সংসদের সংশোধনী ক্ষমতা প্রয়োগের পরিবর্তে গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে।

তিনি বলেন, যদি পরিবর্তন করা হয়, তাহলে পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ সংশোধনীর যে দশা হয়েছে, একই দশার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কারণ, এ ক্ষেত্রে ডকট্রিন অব বেসিক স্ট্রাকচার লঙ্ঘন করা হয়েছে। তাই গাঠনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে, সংশোধনী ক্ষমতা নয়।

৫ আগস্ট থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্র চলল কীভাবে

শিশির মনিরের বক্তব্যে সাংবিধানিক শূন্যতার প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশ যে প্রক্রিয়ায় চলেছে, তার ব্যাখ্যা শুধু সংবিধানের ১৫৩টি অনুচ্ছেদের মধ্যে খুঁজলে পাওয়া যাবে না।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ৫ আগস্টে শাসনতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা শূন্য হয়ে গেল, ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশ চলল কীভাবে? কোন আইনে? কীসের ভিত্তিতে? এগুলো সংবিধানে নেই, সাংবিধানিক আইনে আছে।

তার মতে, এ কারণেই সরকার যদি শুধু সংবিধানের বিধানগুলো দেখে ওই সময়ের আইনি ভিত্তি খোঁজে, তাহলে উত্তর পাওয়া কঠিন হবে। এর উত্তর খুঁজতে সাংবিধানিক আইন, রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক বিকাশ এবং গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিতে হবে।

তিনি বলেন, এই সময় রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়ার ভিত্তি হিসেবে তিনি কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার বা জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাকে দেখেন। তার দাবি, এই ক্ষমতা সংবিধানের কোনো নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদে আলাদাভাবে লেখা না থাকলেও সাংবিধানিক আইনের আলোচনায় এর অস্তিত্ব রয়েছে।

এ কথা সংবিধানে খুঁজলে আপনি পাবেন না, সাংবিধানিক আইনে খুঁজলে পাবেন, বলেন তিনি। তার মতে, ভারতীয় উপমহাদেশের গণঅভ্যুত্থান ও রাষ্ট্রচিন্তার ইতিহাস এবং বিশ্বের বিভিন্ন বিপ্লবের সাংবিধানিক পরিণতি বিবেচনায় নিলে ৫ আগস্ট থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ের ব্যাখ্যা করা সম্ভব।

ত্রয়োদশ সংশোধনীর নজির

গাঠনিক ক্ষমতার পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে শিশির মনির ১৯৯১ সালের নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঘটনাও তুলে ধরেন।

আরও পড়ুন

তিনি বলেন, সে সময় তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিনকে প্রধান করে সরকার পরিচালনা ও নির্বাচন আয়োজনের যে ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল, তার জন্য তৎকালীন সংবিধানে সরাসরি কোনো বিধান ছিল না। পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করা হয়।

শিশির মনিরের বক্তব্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংশোধনী-সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট এ ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তনের পেছনে জনগণের গাঠনিক ক্ষমতার বিষয়টি স্বীকার করেছে।

রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, মানুষের সরকার গঠন করলেই এবং সংবিধান একবার বানিয়ে ফেললেই নতুন করে সংবিধান বানানোর ক্ষমতা কেউ কেড়ে নিতে পারে না।

তার যুক্তি, এই গাঠনিক ক্ষমতা জনগণের কাছেই থাকে এবং সংবিধানের নির্দিষ্ট ১৫৩টি অনুচ্ছেদের মধ্যে সেটিকে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

দেড় বছরকে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা বলার প্রশ্ন

৫ আগস্ট থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কে কীভাবে সাংবিধানিকভাবে ব্যাখ্যা করা হবে; এই প্রশ্নে শিশির মনির আরও একটি সম্ভাব্য আইনি পরিণতির কথা উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, যদি জনগণের গাঠনিক ক্ষমতাকে স্বীকার করা না হয় এবং ওই সময়ের কর্মকাণ্ডকে সংবিধানের বিদ্যমান ১৫৩টি অনুচ্ছেদের আলোকে বিচার করা হয়; তাহলে ওই সময়ের সাংবিধানিক অবস্থার ব্যাখ্যা করা কঠিন হবে। এমনকি তখন ওই সময়কে সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে বিবেচনা করার প্রশ্ন উঠতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এর পরিণতি কী হবে; এমন প্রসঙ্গে তিনি ১৯৭৫-৭৯ সময়ের উদাহরণ টানেন।

পঞ্চম সংশোধনীর উদাহরণ

শিশির মনির বলেন, রাষ্ট্রের কোনো একটি পর্যায়ের কর্মকাণ্ডকে পরবর্তী সময়ে সংবিধানের মাধ্যমে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা আগেও হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে পঞ্চম সংশোধনী পাস করেন এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময়ের কর্মকাণ্ডকে আদালতে প্রশ্নবিদ্ধ না করার বিধান রাখা হয়।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে পঞ্চম সংশোধনী-সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ওই সময়ের কর্মকাণ্ডকে অবৈধ ঘোষণা করে বলে শিশির মনির উল্লেখ করেন। একইভাবে সপ্তম ও পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েও আদালত অসাংবিধানিকতার প্রশ্নে সিদ্ধান্ত দিয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এ কারণেই ৫ আগস্ট থেকে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়কে ভবিষ্যতে আইনি চ্যালেঞ্জ থেকে সুরক্ষা দিতে একই ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।

এখনো কি তফসিলে এই কথা বলবেন, ৫ আগস্ট থেকে শুরু করে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যা কিছু করা হয়েছে, তা নিয়ে কোনো আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না? এ রকম তো আগেও করা হয়েছিল। তা কি আছে? তা কি টিকেছে? টেকেনি তো, বলেন শিশির মনির।

সংস্কার পরিষদই টেকসই

এই আইনি ঝুঁকি এড়াতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন শিশির মনির। তার মতে, গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে কাঠামোগত সংস্কার সম্পন্ন করা হলে সেটির সাংবিধানিক ভিত্তি আরও সুস্পষ্ট হবে।

তিনি বলেন, একমাত্র পথ হলো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংস্কার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা। তার বক্তব্য, বিদ্যমান দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সংবিধান সংশোধন করা হলে ভবিষ্যতে আদালতে সেই সংশোধনের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অতীতের সংশোধনীগুলোর পরিণতি দেখেই এই আশঙ্কা করছেন তিনি।

শিশির মনির বলেন, টু-থার্ড মেজরিটি দিয়ে যদি সংবিধান সংশোধন করেন, তাহলে সেই দশাই হবে, যে দশা হয়েছিল পঞ্চম, সপ্তম, ত্রয়োদশ, পঞ্চদশ ও ষোড়শ সংশোধনীতে।

ছয় মাসেও শেষ হয়নি

শিশির মনির বলেন, যে সমঝোতার ভিত্তিতে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে জাতীয় নির্বাচনের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টিও ছিল বলে তিনি দাবি করেন। তার মতে, সংস্কার পরিষদ গঠন করে সব পক্ষকে নিয়ে সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করা উচিত ছিল।

তিনি বলেন, এ কাজ ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। ১৭ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সরকার গঠিত হয়েছে, ১৭ আগস্টে ছয় মাস চলে গেছে। এর মধ্যে এই বিতর্ক জিইয়ে রাখার কোনো মানে থাকতে পারে?

তার মতে, সরকারের প্রথম অধিবেশনেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন ছিল। শিশির মনির বলেন, অযথা বিতর্ক করে সময় নষ্ট করার কিছু নেই। টেকসই সমাধান যেটা হবে, সেটা সবাই গ্রহণ করবে।

তিনি বলেন, ‘গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সংস্কার সম্পন্ন করার পর পরিষদ বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে এবং সরকার স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। দয়া করে, সংস্কার পরিষদ গঠনের দিকে সকলে অগ্রসর হন। তবেই ৫ আগস্ট থেকে শুরু করে ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একটা লজিক্যালি ইন্টারপ্রিটেড কনস্টিটিউশনাল ল আমরা দেখতে পাব।’

তার ভাষায়, ‘গণভোটের রায়ের আলোকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান করা দরকার। সংশোধনের মাধ্যমে অস্থায়ী সমাধান কারো জন্য কল্যাণকর হবে না। আমরা কোনো টেম্পোরারি সলিউশনের পক্ষে না।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad