ছোটবেলায় চয়নিকা চৌধুরীর স্বপ্ন ছিল রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী হওয়ার। মিতা হক, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা ও সনজীদা খাতুন ছিলেন তার অনুপ্রেরণা। গান শিখতে শান্তিনিকেতনেও গিয়েছিলেন। সংসার ও পারিবারিক দায়িত্বের কারণে সেই পথে আর এগোনো হয়নি। তবে শিল্পচর্চা থামেনি; লেখালেখির পথ ধরে এসেছেন নির্মাণে। ২০০১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ‘শেষ বেলায়’ নাটকের শুটিং দিয়ে শুরু হয়েছিল তার নির্মাতাজীবন। এ বছর সেই যাত্রার ২৫ বছর পূর্ণ হলো।
এই পূর্তি উপলক্ষে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) একই দিনে পাঁচটি টেলিভিশন চ্যানেলে চয়নিকার পাঁচটি নাটক প্রচারিত হয়েছে—চারটি নতুন, একটি পুরোনো। চয়নিকা বলেন, ‘আমার জানা মতে, বাংলাদেশের কোনো পরিচালকের ২৫ বছর পূর্তিতে একই দিনে একই সময়ে একসঙ্গে চার-পাঁচটি নাটক প্রচারিত হয়নি। আমার জন্য এটিই বড় অর্জন ও প্রাপ্তি।’
দীর্ঘ পথের বাধা-বিপত্তির গল্প করতে চাননি চয়নিকা। নিজের সম্পর্কে বলেন, ‘আমি নিজেকে মেধাবী পরিচালক মনে করি না, তবে আমি অনেক পরিশ্রমী। আমি আমার কাজকে খুব ভালোবাসি। আমার কাছে কাজটা প্রার্থনার মতো, কাজটাই আমার একমাত্র প্রেম।’
চয়নিকার মিডিয়া ক্যারিয়ার শুরু ১৯৭৭ ও ১৯৭৮ সালে ‘নতুন কুঁড়ি’তে আবৃত্তি, গান ও নাচে অংশ নেওয়া থেকে। ১৯৯৮ সালে ‘বোধ’ নাটক দিয়ে চিত্রনাট্যকার হিসেবে কাজ শুরু করেন। নির্মাতা হিসেবে তার প্রথম কাজ ‘শেষ বেলায়’। তাকে নাটকটি বানানোর সুযোগ দিয়েছিলেন লাইট অ্যান্ড শ্যাডোর মুজিবুর রহমান ও জায়েদান রাব্বী। তবে নাটকটি প্রচার হয়নি। প্রথম প্রচারিত নাটক ‘এক জীবনে’, যা প্রযোজনা করেছিল অ্যাড মিডিয়া। প্রযোজনায় ছিলেন জায়েদান রাব্বী ও চয়নিকার বোন তমালিকা কর্মকার।
চয়নিকা বলেন, ‘অপি করিম, শাহেদ শরীফ খান, শ্রাবন্তীসহ অনেক শিল্পী আমার সঙ্গে কাজ করেছেন। তাদের কারণে কখনো মনে করিনি যে আমি নতুন। মনে হয়েছে, আমি কাজ করতে পারি।’
আজকের অবস্থানে আসার পেছনে চয়নিকা ঋণী ইমদাদুল হক মিলন, মাহফুজ আহমেদ, মোস্তফা কামাল সৈয়দ ও ফরিদুর রেজা সাগরের কাছে। তবে সবচেয়ে বড় ঋণ পরিবারের কাছে।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পায় চয়নিকার প্রথম চলচ্চিত্র ‘বিশ্বসুন্দরী’। ২০২৩ সালের ঈদুল আজহায় মুক্তি পায় ‘প্রহেলিকা’। চলচ্চিত্রটি কোনো ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পায়নি। কিন্তু তার মতে ছবিটি কয়েকটি বিভাগে পুরস্কার পাওয়ার উপযুক্ত ছিল। চয়নিকা বলেন, ‘কিছু পাক বা না পাক, বুবলীর পাওয়া উচিত ছিল। আমি এখনো বলব, ২০২৩ সালে কোনো নারী অভিনয়শিল্পীর পুরস্কার পাওয়ার কথা হয়ে থাকলে সেটা ‘প্রহেলিকা’র বুবলীর। আর দ্বিতীয়ত, সেটা ‘সুড়ঙ্গ’র তমা মির্জা। তারা যৌথভাবেও পেতে পারত।’
তার মতে ছবির গান ‘মেঘের নৌকা’, সিনেমাটোগ্রাফি ও চিত্রনাট্য পুরস্কার পাওয়ার উপযুক্ত ছিল। তিনি বলেন, ‘মাহফুজ আহমেদ অনেক দিন পর খুব ভালো অভিনয় করেছেন। সে ক্ষেত্রে তিনি ও শাকিব খান যৌথভাবে পুরস্কার পেতে পারতেন। যাই হোক, পুরস্কার কারা পাবেন, সেটা সংশ্লিষ্টদের ব্যাপার।’
‘বিশ্বসুন্দরী’ পুরস্কার পেলেও অভিনেত্রী চম্পা ও চিত্রনাট্যকার রুম্মান রশীদ খানের পুরস্কার না পাওয়া মেনে নিতে পারেননি বলে জানান তিনি।
চয়নিকা জানান, তার পরবর্তী দুটি সিনেমা ‘মাতাল হাওয়া’ ও ‘সখা: দ্য সোলমেট’। ঘোষণার অনেক পরেও কাজ শুরু না হওয়ার কারণ জানতে চাইলে বলেন, গেল দুই বছর দেশের পরিস্থিতির কারণে তিনি ছবিগুলো নির্মাণ করেননি।
‘মাতাল হাওয়া’ নিয়ে শাবনূর ও মাহফুজ আহমেদের নাম শোনা গিয়েছিল। চয়নিকা জানান, ওই কাস্টিং এখন আর নেই। শাবনূর এখন কাজ করছেন না; চয়নিকা অনেক দিন অপেক্ষা করেছেন। নতুন কাস্টিং নিয়ে তার বক্তব্য, ‘সবকিছু চূড়ান্ত, তবে ঘোষণা আসবে শুটিং শেষে।’ গোপনে শুটিং করছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কেন গোপনে শুটিং করব? আমি কাজ লুকিয়ে করার মানুষ নই।’
নারী নির্মাতাদের জন্য কী পরামর্শ, এ প্রশ্নে চয়নিকা শুরুতেই জেন্ডারের প্রসঙ্গ সরিয়ে দেন। ‘নির্মাতার কোনো জেন্ডার হয় না। নির্মাতা নির্মাতাই। নির্মাতা হতে সবার আগে দরকার ধৈর্য। কাজের নির্দিষ্ট সময় নেই, অনেক রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়, শুক্রবারেও শুটিং থাকে। একটি মেয়ের নির্মাতা হিসেবে কাজ করতে পরিবারের সাপোর্ট দরকার। নির্মাতাকে কাজের সব সেগমেন্ট জানতে হবে; শুধু ক্যামেরাম্যানের ওপর নির্ভর করলে কিংবা ভাবলে যে এডিটিং পরে হয়ে যাবে, দীর্ঘদিন কাজ করা সম্ভব নয়।’


