মাস খানেক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স ও ব্যাংকিং বিভাগের এক শিক্ষার্থীর বাবার ফোনে হঠাৎ কল আসে। দাবি করা হয়, তার ছেলেকে ইয়াবাসহ পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। হুবহু ছেলের কণ্ঠের আকুতি ও কান্নার আওয়াজও শোনানো হয় বাবাকে। কল চলার সময় পুলিশের সাইরেন বাজছিল।
সেই শিক্ষার্থীর মা সেসময় অসুস্থ ছিলেন। যে ব্যক্তি কলটি করেছিলেন, তিনি শুরুতেই বলেন, ‘ওর মা তো অসুস্থ, তাই আপনাকে কল দিচ্ছি।’
তার বাবার সন্দেহ করার মতো আর কারণ ছিল না। পরে ২ লাখ টাকা দাবির বিপরীতে দর কষাকষিতে ৩০ হাজার ৫৫৫ টাকা একটি মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে ক্যাশ-ইন করেন তিনি। কয়েক ঘণ্টা পর ছেলে ঢাকার বাসায় ফিরলে তার সঙ্গে কথা বলে বাবা বুঝতে পারেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তার স্বজনদের সঙ্গে এমন একাধিক প্রতারণার তথ্য জানতে পেরেছে টাইমস অব বাংলাদেশ। প্রতিবারই যার কথা বলে কল করা হয়, হুবহু তার কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে কান্নাকাটি বা আকুতি জানানো হয়। এরপর মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে আদায় করা হয় টাকা।
ভুক্তভোগীরা জানান, একটি ছাত্রাবাসেরই একাধিক শিক্ষার্থী ও তার স্বজনদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। অন্যান্য ছাত্রাবাস থেকেও একই ধরনের অভিযোগ আসছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের ডেটা বা ব্যক্তিগত তথ্য কোনো না কোনোভাবে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে।
যেসব শিক্ষার্থীর নামে স্বজনদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে, তাদের কণ্ঠস্বর কীভাবে নকল করা হয়েছে, সেটি নিয়েও তৈরি হয়েছে বিস্ময়।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হলেও এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ-ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের টাইমসকে বলেন, তাদের কাছে অনেক অভিযোগ এসেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক ভুক্তভোগী জানান, ‘গত ২৫ আগস্ট তার মায়ের নম্বরে একটি কল করে বলা হয়, তারা গোয়েন্দা পুলিশ থেকে বলছেন। ফোনে তারা জানায়, আমার বন্ধু এবং আমি পকেটে ইয়াবাসহ ধরা পড়েছি। এরপর তারা বলে, আপনার ছেলের কোনো দোষ নেই। তবে তারা কিছু টাকা-পয়সা দাবি করে এবং ধমকের সুরে অনেক কিছু বলে।’
ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আম্মুর যেহেতু বয়স বেশি তাই তিনি কিছু বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এ ছাড়া সুনাম ক্ষুণ্নের বিষয়টিও ছিল। প্রথম দফায় ৩০ হাজার টাকা নিয়েছিল তারা। পরে আরও কিছু টাকা দেওয়া হয়।’
তার মায়ের সঙ্গে কল চলার সময় হুবহু তার কণ্ঠে কথা বলা হয় এবং তিনি কাঁদছেন, এমন অভিনয় করে তার মায়ের মন নরম করা হয়।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইসিটি সেলের অতিরিক্ত পরিচালক মোস্তাক আহমেদ দাবি করেন, তাদের ডেটা সেন্টার হ্যাক হয়নি কিংবা হওয়ার সুযোগও নেই।
তাহলে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্য, তার বাবা-মায়ের ফোন নম্বর কীভাবে প্রতারকরা পাচ্ছে-এই প্রশ্নে তিনি বলেন, আইসিটি সেল বাদেও বিভিন্ন অফিসে এমন তথ্য আছে। কাজেই শিক্ষার্থীদের মোবাইল নম্বর কীভাবে অন্যদের কাছে যাচ্ছে, সেটি এখনো নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না।
আইসিটির অতিরিক্ত পরিচালক এক পর্যায়ে বলেন, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ অফিসেও অনেক তথ্য থাকে। সেখান থেকেও ফাঁস হওয়ার সুযোগ আছে। তবে নাম প্রকাশ না করে সেই কার্যালয়ের এক কর্মী বলেন, ‘আমাদের সিস্টেমে কোনো হ্যাকিং বা ডেটা লিকের ঘটনা ঘটেনি।’
প্রতারণার কোনো অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি, এমন দাবিও করেন মোস্তাক আহমেদ। অবশ্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার কথা না জানলেও সহকর্মীদের সঙ্গে ভিন্ন কৌশলে প্রতারণার কথা জানান তিনি।
তবে আইসিটি সেলের এই কর্মকর্তার দাবি মানতে নারাজ গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী মাশনুন আলম স্নিগ্ধ।
টাইমসকে তিনি বলেন, ‘কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যই নয়, তার বাবা-মায়ের নম্বরও তারা পেয়ে যাচ্ছে। তথ্যের উৎস বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা সিস্টেম কি না, সেটি আইসিটি সেলের মাধ্যমে দ্রুত প্রযুক্তিগত অডিট করে নিশ্চিত করা দরকার।’
এই শিক্ষার্থী জানান, যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সিস্টেম থেকে তথ্য ফাঁসের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে এর দায় নির্ধারণ করে ব্যবস্থা নিতে হবে। আর তথ্য ফাঁস না হলেও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আরও কঠোর ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভুক্তভোগী আরেক নারী শিক্ষার্থীও তার সঙ্গে এমন প্রতারণার ঘটনা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রথমে এমন নিখুঁত তথ্য ব্যবহার করে আমাকে প্রতারণা করা হয় যে আমি সন্দেহ করেছিলাম আমার কাছের কেউ বা আমার আশেপাশে যারা থাকে তাদের ভেতর কেউ এমনটি করেছে। কিন্তু পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেকের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটতে দেখে মনে হয়েছে আমাদের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়েছে। অন্যথায় এমন হওয়া সম্ভব নয়।’
ভয়েস ক্লোনিং ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের পরিবারের সঙ্গে প্রতারণার এমন ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে আছেন। গত দুই মাস ধরে এমন ঘটনা ঘটছে বলে তারা জানিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর মো. ইসরাফিল রতন টাইমস’কে জানান, তাদের টিমের সদস্য ইউসুফ হারুন এবং চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আজহারুল ইসলাম শেখের ছেলের সঙ্গেও এমনটি ঘটেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কী করছে- এই প্রশ্নে প্রক্টর বলেন, তারা সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন করতে চাচ্ছেন যেন প্রতারকদের শনাক্ত করা যায়।
তিনি জানান, ‘এ ব্যাপারে পুলিশের কাছে গেলে জানানো হয় আইডি ক্লোনিং করে এমন অপরাধ করা হচ্ছে। পুলিশ এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নিতে চলেছে।’
ফাইন্যান্স বিভাগের যে শিক্ষার্থীর বাবা প্রতারকদের মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে ৩০ হাজার টাকার বেশি পাঠিয়েছিলেন, তিনি ঢাকার শেরে বাংলা নগর থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন।
এই সাধারণ ডায়েরির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে থানার এসআই মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান রিয়াদকে। তিনি কী জানতে পারলেন, এ কথা জানতে তাকে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও তার বাবা টাইমস’কে জানান, জিডি করার পর তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তদন্ত কর্মকর্তার পক্ষ থেকে তাদেরকে কিছু জানানো হয়নি। একাধিকবার তারা ফোন করে অগ্রগতি জানতে চাইলে বলা হয়েছে, তদন্ত চলমান আছে।
ডিজি করার পর সেটি খুব বেশি আলোচনায় না এলে এ নিয়ে পুলিশের নিষ্পৃহতার অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও অসংখ্য ঘটনায় দেখা গেছে, জিডিকে একটি সাধারণ আনুষ্ঠানিকতা হিসেবেই দেখা হয়।
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জানান, পুলিশের কাছ থেকে কোনো তথ্য না পেয়ে তারা যে মোবাইল ব্যাংকিং হিসাবে টাকা পাঠিয়েছিলেন, সেই কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখানে অভিযোগ করার পর জানানো হয়, ওই হিসাবে তখন ৬৩০ টাকা ছিল।
পরিবারটি সেই নম্বর ট্র্যাক করতে পারলেও পুলিশ কেন পারেনি, এ প্রশ্নের জবাবে এসআই জাহিদুল হাসান টাইমস’কে বলেন, ‘যেহেতু ভয়েস ক্লোনিং ঘটেছে তাই শনাক্ত করতে অসুবিধা হচ্ছে।’
অভিযোগটি পুলিশের সাইবার ক্রাইমস টিমে পাঠানো হবে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘যে মোবাইল নম্বরে টাকা দেওয়া হয়েছে তার আইডি বের করার কাজ চলমান রয়েছে।’
তথ্য প্রযুক্তি বিশারদ ও বিডি জবসের প্রধান নির্বাহী ফাহিম মাশরুর বলেন, ‘এই সময়ে ভয়েস ক্লোনিং কঠিন কিছু নয়। যে কেউ কলের সময় তা রেকর্ড করে ক্লোন করতে পারে। এমন ঘটনা আগেও আমাদের কাছে এসেছিল।’
এত শিক্ষার্থীর তথ্য কীভাবে ফাঁস হতে পারে, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তথ্য ফাঁস করতে হ্যাক করাও জরুরি নয়। সব বিভাগের কাছেই তাদের শিক্ষার্থীদের তথ্য আছে। এখান থেকে যে কোনো কর্মী তা ফাঁস করে দিতে পারে। আইডি কার্ড ফটোকপি করার সময়ও সে তথ্য ব্যবহার করা যেতে পারে।’


