আওয়ামীকরণ থেকে বিএনপিকরণ: রাজনীতিকরণের চেনা চক্র

আওয়ামীকরণ থেকে বিএনপিকরণ: রাজনীতিকরণের চেনা চক্র
Advertisement
Advertisement

সরকার বদলালেই একটি মুখস্থ প্রতিশ্রুতি শোনা যায়: রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় প্রভাব থেকে মুক্ত করা হবে, আর সরকারি প্রশাসন চলবে মেধা ও নিরপেক্ষতার নিয়মে। কিন্তু প্রতিবারই একই অস্বস্তিকর প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে—রাজনীতিমুক্ত করার এই অঙ্গীকার কি সত্যিই বাস্তবায়িত হয়, নাকি কেবল মুখের নামটাই বদলে যায়?

সরকারি চাকরি আর রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো সাধারণ মানুষের সেবা করার জন্য, কোনো রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নয়। মেধা, স্বচ্ছতা আর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম মেনে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন হওয়ার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস অন্য কথা বলে। এখানে কোনো সরকারই দলীয় স্বার্থ আর রাষ্ট্রের দায়িত্বকে আলাদা রাখতে পারেনি।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সমালোচকদের মূল অভিযোগ ছিল—তারা কোটা পদ্ধতি, রাজনৈতিক চাপ আর দলীয় স্বজনপ্রীতির জাল বিছিয়ে পুরো নিয়োগ ব্যবস্থা ও প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল। তখনকার রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের মানুষ আশা করেছিল, নতুন দিনে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও স্বাধীন ও পেশাদার হয়ে উঠবে।

তবে সাম্প্রতিক বেশ কিছু ঘটনা সেই আশায় ছাই দিয়েছে। মনে হচ্ছে, দলীয় পতাকা বদলালেও পুরোনো সেই অভ্যাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

সর্বশেষ আলোচনা শুরু হয়েছে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার খালি পদগুলোতে দ্রুত নিয়োগ দেওয়ার জন্য চার সদস্যের একটি “উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন” কমিটি গঠন নিয়ে। দৈনিক সমকালসহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, এই কমিটির প্রধান করা হয়েছে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারীকে।

উদ্বেগের কারণ কিন্তু স্রেফ একটি নিয়োগ কমিটি গঠন নয়। প্রশাসনিক প্রয়োজন মেটাতে সরকার মাঝেমধ্যেই এমন কমিটি করে থাকে। আসল উদ্বেগের জায়গা হলো, যে প্রক্রিয়ায় সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বচ্ছ পরিবেশ থাকা জরুরি, সেখানে সরাসরি রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ঢুকে পড়ছে কি না।

পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) বা সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের মতো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সরকারি চাকরির নিয়োগ পরিচালিত হওয়া উচিত। সেখানে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি যখন সরাসরি নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় বসে যান, তখন মেধানীতি ও প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিয়ম ঠিকঠাক বজায় থাকবে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

কেবিনেট সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ও জনপ্রশাসন সচিবের মতো শীর্ষ আমলাদের এই কমিটিতে রাখায় বিতর্ক আরও ঘনঘনীভূত হয়েছে। পেশাদার আমলাতন্ত্রের কাজ রাষ্ট্রের সেবা করা, কোনো বিশেষ দলীয় সংস্থার নয়। যখন প্রার্থী বা কর্মকর্তারা দেখতে পান যে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বেশি কাজে দিচ্ছে, তখন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকে।

রাজনৈতিক প্রভাবের এই আলোচনা শুধু চাকরির নিয়োগেই আটকে নেই; নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের মতো সংবেদনশীল জায়গায় পদায়ন নিয়েও নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

নির্বাচন কমিশনে এক অতিরিক্ত সচিবের পদায়ন নিয়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো কড়া সমালোচনা করেছে। সামনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন, তাই এমন মুহূর্তে রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত কোনো কর্মকর্তাকে সংবেদনশীল পদে রাখা ঠিক কি না—তা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছে। তারা শুধু কমিশনের কাছে লিখিত আপত্তিই জানায়নি, বরং ‘লং মার্চ’-এর মতো প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেওয়া এসব পদায়ন বাতিলের দাবি জানিয়েছে।

আরও পড়ুন

সরকার বা কর্তৃপক্ষ হয়ত যুক্তি দেবে, প্রচলিত প্রশাসনিক নিয়ম মেনেই এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে স্রেফ কাগজের আইনি বৈধতাই সব নয়। সিদ্ধান্তগুলো সাধারণ মানুষের চোখে কতটা সৎ, নিরপেক্ষ ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত মনে হচ্ছে—তার ওপরই আসল জনআস্থা তৈরি হয়।

এই সমস্যা কেবল একটি নির্দিষ্ট সংস্থায় আটকে নেই। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় বিভাগ ও স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ নিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকার সমালোচনার মুখে পড়েছে। নিয়োগপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক পরিচয় আর দলীয় আনুগত্য সিদ্ধান্তের পেছনে ভূমিকা রাখছে কি না—তা নিয়ে চারদিকে প্রশ্ন উঠছে।

ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই “বিএনপিকরণ” ধারণাটি সামনে এসেছে। এটি কেবল বিরোধীদের রাজনৈতিক স্লোগান নয়; বরং এক গভীর উদ্বেগের প্রকাশ। এক দলের আমলে যার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছিল, নতুন শাসকদল এসে আবার সেই একই প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের পুনরাবৃত্তি করছে কি না—মানুষ এখন সেটাই দেখছে।

আসল সংকট কিন্তু ‘আওয়ামীকরণ’ নাকি ‘বিএনপিকরণ’—কোনটা বেশি খারাপ তা নিয়ে নয়। মূল সংকট হলো, বাংলাদেশের প্রতিটি শাসকদলই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজেদের লোকজনদের সুবিধা দিয়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাব বাড়াতে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করেছে। নাম বদলায়, কিন্তু চিত্র একই থাকে: নতুন সরকার চেয়ারে বসে, আর পুরোনো অপসংস্কৃতি বহাল তবিয়তে টিকে থাকে।

এই বৈপরীত্য সবচেয়ে বেশি পীড়াদায়ক, কারণ ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রক্তক্ষয়ী কোটা সংস্কার আন্দোলনের ওপর ভর করেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। সেই আন্দোলনের মূল দাবি ছিল একদম পরিষ্কার: সরকারি চাকরিতে দলীয় পরিচয় বা বিশেষ সুবিধা নয়, মেধার ভিত্তিতে সুযোগ দিতে হবে।

একটি ন্যায্য ও সৎ নিয়োগ ব্যবস্থার দাবিতে হাজার হাজার তরুণ রাস্তায় নেমেছিল, যেখানে স্রেফ যোগ্যতাই হবে একমাত্র মাপকাঠি। তাদের বার্তা ছিল সুনির্দিষ্ট—সরকারি চাকরি বা সেবা কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়, তা দেশের সব যোগ্য নাগরিকের অধিকার।

কোনো সরকার যদি ক্ষমতায় এসে আগের সরকারের সময় তাদেরই সমালোচনা করা পুরোনো ব্যবস্থার পুনরাবৃত্তি করে, তবে তা প্রশাসনিক সংস্কারের পুরো আন্দোলন ও তার মূল চেতনার ওপর মানুষের বিশ্বাস ভেঙে দেবে।

রাজনীতিপ্রবণ নিয়োগ ও পদায়নের পরিণতি সুদূরপ্রসারী। প্রথমত, এটি সেইসব মেধাবী তরুণ-তরুণীদের হতাশ করে, যারা বছরের পর বছর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য দিনরাত পরিশ্রম করে। পুরো ব্যবস্থা রাজনৈতিক প্রভাবাধীন মনে হলে তরুণেরা উৎসাহ ও আস্থা দুটোই হারিয়ে ফেলে।

দ্বিতীয়ত, এটি প্রশাসনিক নিরপেক্ষতাকে নষ্ট করে। আমলারা যখন বুঝতে পারেন যে কাজের দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যই পদোন্নতি পাওয়ার আসল চাবিকাঠি, তখন তারা জনসেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের প্রতি অবহেলা করা শুরু করেন।

তৃতীয়ত, এটি সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব ফেলে। কৃষি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা ও নির্বাচন পরিচালনার মতো সংবেদনশীল খাতগুলোতে দক্ষ ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তা থাকা বাধ্যতামূলক। পদায়নে যখন রাজনৈতিক চশমা পরা হয়, তখন এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা পুরোপুরি ধসে পড়ে।

তাই বাংলাদেশের সামনে আসল চ্যালেঞ্জ এক ধরনের রাজনীতিকরণ সরিয়ে আরেক ধরনের রাজনীতিকরণ চালু করা নয়। প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো এমন এক শক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা, যা ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও নিজের নিরপেক্ষতা ধরে রাখতে পারে।

বিএনপির সামনে এখন প্রমাণ করার সুযোগ এসেছে যে তাদের ‘পরিবর্তনে’র ওয়াদা কেবল ক্ষমতার হাতবদলেই সীমিত নয়। নিয়োগে স্বচ্ছতা আনা, পিএসসি’কে স্বাধীন রাখা, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার প্রতি সম্মান জানানো আর প্রশাসনে পেশাদারত্ব ফিরিয়ে আনা হতে পারে এই পুরোনো চক্র ভাঙার সত্যিকারের পদক্ষেপ।

সরকারি চাকরি বা রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো কোনো নির্বাচনে জেতার পুরস্কার নয়। এগুলো এদেশের নাগরিকদের সম্পদ, জনস্বার্থে ব্যবহার করার জন্যই এগুলোর সৃষ্টি। প্রতিবার নির্বাচনের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক রঙ বদলে দিয়ে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। সেটিকে ‘আওয়ামীকরণ’ বলা হোক বা ‘বিএনপিকরণ’—ফলাফল একই: দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, নষ্ট হতে থাকা জনআস্থা আর একটি নড়বড়ে রাষ্ট্র।

রাজনৈতিক পরিবর্তনের মূল মাপকাঠি এটি নয় যে ক্ষমতায় কে বসেছে; আসল পরীক্ষা হলো—ক্ষমতা বদলালেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা নিরপেক্ষ, পেশাদার ও স্বাধীন থাকতে পেরেছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর