ঢাকার ইস্কাটনের সেই ফ্ল্যাটটি আজও আছে। নেই শুধু চিত্রনায়ক সালমান শাহ, যিনি ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর এই ফ্ল্যাটেই শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। সেদিন প্রথমে থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল। কিন্তু ছেলের মৃত্যুকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে পারেননি বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি আদালতে আবেদন করেন, ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে তদন্তের দাবি জানিয়ে।
এরপর কেটে গেছে অনেক বছর। বদলেছে তদন্ত সংস্থা, জমা পড়েছে শত শত পৃষ্ঠার প্রতিবেদন। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে পিবিআই তাদের ৬০০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে জানায়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি, এটি আত্মহত্যা। প্রতিবেদনটি মেনে নিতে পারেননি তার মা নীলা চৌধুরী। আদালতের ওই প্রতিবেদন গ্রহণের বিরুদ্ধে তিনি ২০২২ সালের ১২ জুন রিভিশন আবেদন করেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের দুই মাস যেতে না যেতেই সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে নতুন করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। আসামির তালিকায় নাম ওঠে তার সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, খলনায়ক আশরাফুল হক ডনসহ মোট ১১ জনের।
২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক নির্দেশ দেন, অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে এজাহারভুক্ত করতে হবে। আদেশে বিচারক বলেন, ‘এটি একটি চাঞ্চল্যকর মামলা এবং ঘটনাটির রহস্য উদ্ঘাটনের জন্য মামলাটি পুনরায় তদন্ত করা প্রয়োজন।’
তদন্তের ভার এবার সিআইডির ওপর। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ আদালতের কাছে সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে তোলার অনুমতি চান। ২০২৬ সালের ১০ জুন আদালত সেই অনুমতি দেন। কিন্তু এই আদেশও দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। মামলার বাদীপক্ষের করা আবেদনের ভিত্তিতে গত ২ আগস্ট হাইকোর্ট দেহাবশেষ উত্তোলনের আদেশ বাতিল করে দেন।
আইনজীবীদের একাংশ বলছেন, মরদেহ তোলার চেয়ে এই মুহূর্তে এজাহারনামীয় আসামিদের গ্রেপ্তার করাই বেশি জরুরি। সেই তালিকার চার নম্বর আসামি খলনায়ক ডনকেও সম্প্রতি গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তিন দশক আগে এই মামলাতেই রাজসাক্ষী হয়েছিলেন সালমান শাহর তৎকালীন এক ভক্ত রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ। তিনি জবানবন্দিতে নায়কের মৃত্যুর ঘটনায় কয়েকজনের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছিলেন। নতুন আদেশে তার সেই জবানবন্দিও সাক্ষ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ ৩০ বছর পরও প্রশ্নটা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে— ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঠিক কী ঘটেছিল সেই ফ্ল্যাটে? আদালতের নথি বদলেছে, তদন্ত সংস্থা বদলেছে, আদেশ হয়েছে, আবার বাতিলও হয়েছে। কিন্তু একজন মা এখনো অপেক্ষায় আছেন, একটি মীমাংসার আশায়। আর ভক্তদের কাছে সালমান শাহ থেকে গেছেন যেমন ছিলেন— চিরঞ্জীব, রহস্যে মোড়া এক নাম।
ডন গ্রেপ্তার, কিন্তু বাকি ১০ জন কোথায়?
মোহাম্মদ আশরাফুল হক ডন এখন কারাগারে। তবে তার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সালমান শাহ হত্যা মামলায় নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—মামলার বাকি ১০ আসামি কোথায়?
টাইমস অব বাংলাদেশের কাছে থাকা তথ্য অনুযায়ী, সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক হত্যা মামলা দায়েরের আগ পর্যন্ত দেশে ছিলেন। ২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর তিনি আদালতে হাজির হয়েছিলেন। এরপর ২০ অক্টোবর আদালত অপমৃত্যুর মামলাটি হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়ার পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। বর্তমানে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
হত্যা মামলা দায়েরের পর সামিরার মা লতিফা হক লুসিও আত্মগোপনে চলে যান বলে জানা গেছে।
মামলায় অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজের মালিক হিসেবে উল্লেখ করা ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে।
ডেভিড, জাভেদ ও ফারুকের ঠিকানা হিসেবে রাজধানীর বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) উল্লেখ করা হয়েছে মামলার নথিতে। তবে তারা বর্তমানে কোথায় আছেন, তা এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
রুবি, এ সাত্তার ও সাজুর অবস্থান সম্পর্কেও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ।
মামলার নথিতে ফরিদপুরের ঠিকানা দেওয়া রেজভি আহমেদ ওরফে ফারহাদ বর্তমানে লন্ডনে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে।
মামলায় মোট ১১ জনকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন সামিরা হক, আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুসি, ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবি, এ সাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ওরফে ফারহাদ।


