সালমান শাহ/ যে গল্পের হয়নি শেষ

যে গল্পের হয়নি শেষ
সালমান শাহ্‌। ছবি সৌজন্যে: টিম সালমান শাহ্‌
Advertisement
Advertisement

তিরিশ বছর পেরিয়ে গেছে। তবু ঢাকাই সিনেমার সেই মুখটি এখনো টিভির পর্দায়, মোবাইলের ওয়ালপেপারে কিংবা ফেসবুকের রিলে ফিরে ফিরে আসে। সালমান শাহ—নব্বই দশকের এক ঝলক আলো, যিনি অকালমৃত্যুর মধ্য দিয়েও যেন সময়কে থামিয়ে দিয়েছেন।

মাত্র চার বছরের ক্যারিয়ার। এই স্বল্প সময়ে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’, ‘তুমি আমার’, ‘সত্যের মৃত্যু নেই’, ‘তোমাকে চাই’-এর মতো ছবি দিয়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে এক ধারার সৃষ্টি করেছিলেন সালমান শাহ। তার কণ্ঠস্বর, শহুরে আধুনিকতা, পোশাক আর প্রেমিক পুরুষের নিজস্ব অভিব্যক্তি—তখনকার দর্শকের কাছে ছিল একেবারেই নতুন। তার উপস্থিতিতে বাংলা সিনেমা যেন হঠাৎ আরও নাগরিক, আরও সমকালীন হয়ে উঠেছিল।

সালমান শাহর স্বল্পায়ু ক্যারিয়ারই হয়তো তার কিংবদন্তি হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ। যে নায়ক বার্ধক্যে পৌঁছাননি, রুপালি পর্দায় যাকে কখনো বয়সের ভারে নুয়ে পড়তে দেখা যায়নি, তাকে ঘিরে দর্শকের কল্পনাও তাই থেমে থাকেনি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, সালমান শাহ ততই হয়ে উঠেছেন এক চিরতরুণ স্মৃতি।

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় সালমান শাহকে। পুলিশের একাধিক প্রতিবেদনে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও শুরু থেকেই ভিন্ন দাবি করে আসছেন তার মা নীলা চৌধুরী। তার দৃঢ় বিশ্বাস, সালমানকে হত্যা করা হয়েছে।

প্রায় তিন দশক পেরিয়েও সেই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। বরং সময়ের সঙ্গে বদলেছে তদন্ত, আদালতের আদেশ ও মামলার গতিপথ। চলতি বছরের জুনে সালমান শাহর মৃত্যুরহস্য উদ্‌ঘাটনে কবর থেকে দেহাবশেষ উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হলেও পরে সেই আদেশ বাতিল হয়ে যায়। ফলে তিন দশক পরও তার মৃত্যু নিয়ে আইনি ও সাধারণের আলোচনা থামেনি।

আরও পড়ুন

অমীমাংসিত এই রহস্য সালমান শাহকে ঘিরে কৌতূহলও জিইয়ে রেখেছে। যারা তাকে সরাসরি দেখেননি, তারাও যেন চেনেন এই নায়ককে—পুরোনো সিনেমা, গান, সংলাপ, ভাইরাল ক্লিপ আর মায়ের চোখের জলে বেঁচে থাকা এক নাম হিসেবে।

প্রতিবছর ৬ সেপ্টেম্বর এলেই তাকে স্মরণ করেন ভক্তরা। হয় মিলাদ ও দোয়ার আয়োজন, হয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্মৃতিচারণা। ‘টিম সালমান শাহ’র মতো ভক্তগোষ্ঠীগুলোও নিয়মিত তার স্মৃতি ধরে রেখেছে। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের প্রদর্শনীতে যখন বিনামূল্যে দেখানো হয় ‘তোমাকে চাই’-এর মতো সিনেমা, তখন সেখানে ভিড় করেন নতুন প্রজন্মের দর্শকেরাও। তাদের অনেকেরই জন্ম সালমান শাহর মৃত্যুর পর।

ইউটিউব আর রিলের যুগে সালমান শাহর পুরোনো সিনেমার গান, সংলাপ, পোশাক ও ফ্যাশনও নতুন করে ফিরে আসে। নব্বই দশকের সেই সোয়েটার, চুলের ছাঁট কিংবা পর্দার উপস্থিতি আজকের তরুণদের মধ্যেও তৈরি করে এক ধরনের নস্টালজিক আবেদন। প্রজন্ম বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, বদলেছে দর্শকের রুচিও। কিন্তু সালমান শাহকে ঘিরে আগ্রহ কমেনি।

সালমান শাহর প্রাসঙ্গিকতা তাই শুধু নস্টালজিয়ার গল্প নয়। এটি একই সঙ্গে একটি অমীমাংসিত রহস্য, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এক সাংস্কৃতিক স্মৃতি এবং বাংলা সিনেমার এক না-ফুরানো ‘যদি’র গল্প।

সময় এগিয়ে গেছে অনেক দূর। কিন্তু ইস্কাটনের সেই ঘরে থেমে যাওয়া গল্পটি আজও শেষ হয়নি। পর্দা নেমেছে বহু আগেই, অথচ দর্শকের মনে সালমান শাহর গল্প এখনো অসমাপ্ত।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর