ঢাকার নারী পোশাকের ঐতিহ্যবাহী বিপণিবিতান গাউছিয়া মার্কেটের সন্তানহীন প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ ইউসুফ সরদার যখন মৃত্যুর আগে তার সম্পত্তি জনকল্যাণে দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তখন তার উদ্দেশ্য ছিল মৃত্যুর পরও যেন এই সম্পদ মানুষের কাজে আসে।
দান করার পেছনের উদ্দেশ্য ছিল একেবারে সরল–এই সম্পত্তি থেকে আসা আয় ব্যবহৃত হবে জনকল্যাণমূলক কাজে। তবে বহু বছর পর সেই উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে থেকে যাচ্ছে প্রশ্ন।
ওয়াকফ এস্টেট হিসেবে পরিচালিত এই সম্পত্তিতে এখন মোট ৫৮৮টি দোকান রয়েছে। কিন্তু ঢাকার অন্যতম ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও এই মার্কেট থেকে অর্জিত আয় সম্ভাব্য আয়ের তুলনায় অনেক কম।
দোকানের অবস্থানভেদে এখান থেকে সংগৃহীত মাসিক ভাড়া মাত্র ১১২ টাকা থেকে ২ হাজার ১১৮ টাকার মধ্যে। অথচ ঠিক রাস্তার অপর পাশে নিউ মার্কেটে একই আকারের একটি দোকান থেকে স্থানভেদে মাসে ১৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা আয় হয়।
এই বৈষম্য কেবল রাজস্ব হারানোর বিষয় নয়। এটি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর সহায়তার মতো যেসব জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য ওয়াকফ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, সেগুলোর সুযোগ হারানোরও প্রতিচ্ছবি।
গাউছিয়া মার্কেট বাংলাদেশের ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোর মুখোমুখি হওয়া এক বিস্তৃত সমস্যার একটি উদাহরণ মাত্র। জনকল্যাণে দান করা সম্পদগুলো প্রায়শই দুর্বল ব্যবস্থাপনা, নিম্ন আয় এবং অবৈধ দখলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দানকারীদের কাঙ্ক্ষিত প্রভাব তৈরিতে বাধা সৃষ্টি করছে।
ইসলাম ধর্মে এ ধরনের জনকল্যাণমূলক দানকে ওয়াকফ বলা হয়। এসব সম্পত্তি তদারকির জন্য সরকারের ‘বাংলাদেশ ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়’ নামে একটি ডেডিকেটেড প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তা সত্ত্বেও দান করা বহু সম্পদ থেকে প্রত্যাশিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা তৈরি সম্ভব হচ্ছে না।
ওয়াকফ প্রশাসক সফিজ উদ্দিন আহমেদ টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, দেশে বর্তমানে ৫ লাখ ৩৭ হাজার একরেরও বেশি ওয়াকফ সম্পত্তি রয়েছে।
এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে, যার অর্থ দাঁড়ায় ওয়াকফ জমির প্রায় ২০ শতাংশই সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
দখল করা সম্পত্তি উদ্ধারে সরকারের প্রচেষ্টা সম্পর্কে ব্যাখ্যা করে সফিজ উদ্দিন বলেন, ‘পৃথিবী যত দিন থাকবে, দখল সম্পত্তি উদ্ধার প্রক্রিয়াও তত দিন চলবে। বেশ কয়েকটি মামলা চলমান রয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে দখল ফেরত নেওয়া হবে।’
ওয়াকফ জমি দখলে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যারা মামলাবাজ, তারা মামলা করেন। এখানে আমাদের কিছু করার নেই।’
তবে ওয়াকফ সম্পত্তি সংক্রান্ত সরকারি তথ্যে অসঙ্গতি রয়েছে।
গত ৭ মে ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ জানান, ওয়াকফ সম্পত্তির পরিমাণ ৬ লাখ ১৪ হাজার একর–যা ওয়াকফ প্রশাসকের দেওয়া তথ্যের চেয়ে ৭৭ হাজার একর বেশি।
কর্মকর্তারা এই তথ্যের ব্যবধানের কোনো কারণ ব্যাখ্যা করতে পারেননি।
সমস্যাটি কেবল জমি দখলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এমনকি যেগুলো ব্যবস্থাপনার অধীনে রয়েছে, সেগুলো থেকেও বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম রাজস্ব আসছে।
চকবাজারের শাহী মসজিদে ২০২৫ সালে কমিটি পরিবর্তনের পর মাসিক ভাড়া বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫২ হাজার টাকায়। পূর্ববর্তী কমিটি মাত্র ৩৫ হাজার টাকা আদায় করত, ফলে মাসে ২ লাখ ১৭ হাজার টাকার ব্যবধান থেকে যেত। কম আদায়ের পেছনে কোনো জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি।
মিরপুরের শাহ আলী মাজার আরেকটি উদাহরণ। সরকারি নথি অনুযায়ী, মাজারটির ৩২ দশমিক ১৪ একর জমি রয়েছে। তবে মিরপুর ভূমি অফিসের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাত্র ৫ দশমিক ৭৬ একর জমি দখলে আছে।
মাজারের ব্যবস্থাপক মোর্শেদ আলম ২৭ দশমিক ৭৭ একর জমির মালিকানা দাবি করেছেন। তার দেওয়া হিসাব মানলেও ২২ দশমিক শূন্য ১ একর জমি এখনো অবৈধ দখলে রয়ে গেছে।
এ এলাকায় কাঠাপ্রতি জমির দাম ১ কোটি টাকার বেশি হওয়ায় দখল করা এই জমির আনুমানিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
ওয়াকফ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ের ওপরও।
ওয়াকফ প্রশাসকের কার্যালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৮ কোটি ১৩ লাখ টাকা, কিন্তু প্রকৃত আদায় হয়েছে মাত্র ৯ কোটি ২০ লাখ টাকা।
একই সময়ে ১ হাজার ৩৫০টি ওয়াকফ সম্পত্তি অডিট করা হয়েছিল, অথচ অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল মাত্র ১১টি ক্ষেত্রে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, দুর্বল তদারকির কারণে মানুষ এখন নতুন ওয়াকফ তৈরি করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘সঠিক তদারকির অভাবে মানুষ আগের মতো আর ওয়াকফ করায় আগ্রহী হচ্ছে না। বিদ্যমান ওয়াকফ সম্পত্তিগুলোর একটি বড় অংশ ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমলে দান করা হয়েছিল।’
ওয়াকফ সম্পত্তির আয় দানকারীদের ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যয় করার কথা। তবে এই আয় কীভাবে জনকল্যাণে ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছেন কর্মকর্তারা।
ফোকাল পয়েন্ট কর্মকর্তা ফরিদ আহমেদ জানান, ওয়াকফ দলিল অনুযায়ী সব কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং অডিটর ও পরিদর্শকরা তা পর্যবেক্ষণ করেন।
তবে ওয়াকফের আয় থেকে অর্থায়ন করা সুনির্দিষ্ট কোনো জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির বিস্তারিত তথ্য দিতে পারেননি ওয়াকফ প্রশাসক।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে তৎকালীন ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা এ এফ এম খালিদ হোসেন ওয়াকফ এস্টেটগুলোকে ডিজিটালাইজ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিলেন। কিন্তু এক বছরেরও বেশি সময় পর এখনো জনসমক্ষে থাকা তথ্যের পরিমাণ সীমিত।
সংগ্রহ পরিকল্পনা, ব্যয় এবং অডিট রিপোর্টের অনুচ্ছেদগুলোতে ২০২৩ সালের পর আর কোনো হালনাগাদ তথ্য নেই। অন্যদিকে মনিটরিং রিপোর্ট ও প্রকল্প বাজেট এখনও অপ্রাপ্য রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওয়াকফ সম্পত্তি সঠিকভাবে পরিচালিত হলে সামাজিক উন্নয়নের একটি বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর মোরাল ডেভেলপমেন্টের পরিচালক আবুল খায়ের মোহাম্মদ ইউনুস বলেন, ওয়াকফের আয় দানকারীর শর্তানুসারে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেন, ওয়াকফ কেবল মসজিদ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ নয়।
তিনি আরও বলেন, ‘রাস্তাঘাট নির্মাণও এক ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজ। মানুষের উপকারে আসে–এমন যেকোনো কাজ ওয়াকফ তহবিলের মাধ্যমে পরিচালনা করা সম্ভব।’
ওয়াকফ সম্পত্তি সাধারণত তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত: ওয়াকফ ফি লিল্লাহ (জনকল্যাণ ও ধর্মীয় উদ্দেশ্যে দান); ওয়াকফ আল-আওলাদ (পরিবার ও বংশধরদের জন্য সংরক্ষিত সম্পত্তি, যা পরবর্তীতে জনকল্যাণে স্থানান্তরিত হয়) ও মিশ্র ওয়াকফ (যেখানে আয় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পারিবারিক সুবিধাভোগীদের মধ্যে বিভক্ত হয়)।
ধর্ম মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২ লাখ ১২ হাজার ৯৯ একর ওয়াকফ আল-আওলাদ সম্পত্তি এবং ৩ লাখ ৭৭ হাজার ১২০ একর ওয়াকফ ফি লিল্লাহ সম্পত্তি রয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে ওয়াকফ সম্পত্তি শিক্ষা বৃত্তি, পাঠাগার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি প্রকল্প এবং সরকারি অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা করে এসেছে।
মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তিকে আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহার করে আরও বিস্তৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করেছে।


