বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলায় সার কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষকেরা। এতে রোপা আমন মৌসুমের শুরুতেই তীব্র দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। মাঠ পর্যায়ের নানা তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্রই পাওয়া গেছে।
কৃষকদের মতে, আমন চাষে সারের আসল চাহিদা তৈরি হতে এখনো অন্তত দুই সপ্তাহ বাকি। তখন চাহিদা আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। প্রশাসন এখনই কঠোর না হলে এই সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।
চাষিদের অভিযোগ, ডিলাররা নামমাত্র সার সাধারণ কৃষকদের দিয়ে বরাদ্দের সিংহভাগই বড় ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। নিয়মনীতি ভেঙে অনেকে কমিশনের বিনিময়ে সাব-ডিলারদের কাছে সার হস্তান্তর করছেন। এমনকি গুদাম থেকে তোলার আগেই বরাদ্দের অর্ধেক সার হাতবদল হয়ে যাওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। এভাবেই কৃত্রিম উপায়ে বাড়ানো হচ্ছে সারের দাম। ফলে বাধ্য হয়ে খুচরা বাজার থেকে চড়া দামে সার কিনছেন চাষিরা।
কোথাও কোথাও সরকারি বরাদ্দের সার বিদেশি ব্র্যান্ডের বস্তায় ভরে বেশি দামে বিক্রি করার অভিযোগও উঠেছে।
নওগাঁর রানীনগর উপজেলায় প্রতি বস্তা সারে কৃষকদের অতিরিক্ত ৩৫০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। বেশি দামে সার বিক্রির দায়ে প্রশাসন কয়েকজনকে জরিমানা করলেও পরদিনই ওই সব দোকানে আগের মতো অনিয়ম শুরু হতে দেখা গেছে। সরকারি কর্মকর্তারা সার সংকট নেই বললেও ডিলারদের দাবি, তারা নিজেরাও বেশি দামে সার কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
এই উপজেলায় বর্তমানে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি)-এর ১১ জন এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ১৯ জন ডিলার রয়েছেন। আগস্ট মাসের জন্য বিএডিসি’র মাধ্যমে উপজেলায় প্রায় ৬০০ টন সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি বিসিআইসি ডিলাররাও বিশেষ বরাদ্দ পেয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. মনজুর রহমান ডিলারদের কাছ থেকে সার কেনার সময় রশিদ সংগ্রহের পরামর্শ দিয়ে জানান, অভিযোগ জানালে তারা কঠোর ব্যবস্থা নেবেন।
তবে, গত বুধবার আবাদপুকুর বাজারের মুন্না ট্রেডার্স থেকে সার কেনা এক কৃষক জানান, তাকে পাঁচ বস্তা সারের জন্য পাঁচ হাজার ৭৫০ টাকার রশিদ দেওয়া হলেও তার কাছ থেকে রাখা হয়েছে ছয় হাজার ৪০০ টাকা। অসহায় এই কৃষক প্রশ্ন তোলেন, তারা বেশি টাকা রাখলে সাধারণ মানুষের আর কী-ই বা করার আছে।
করজগ্রামের ওয়ারিসুল ইসলাম, শহিদুল ইসলাম ও আবদুর রহিমসহ আরও কয়েকজন কৃষকও অতিরিক্ত দাম নেওয়ার একই অভিযোগ করেছেন।
খানপুকুর বাজারের মেসার্স সোনার বাংলা ট্রেডার্সের মালিক ও সাব-ডিলার সবুজ হোসেন জানান, সার বিক্রিতে খুব একটা লাভ না থাকলেও কীটনাশক বিক্রির তাগিদেই দোকানে সার রাখতে হয়। আবাদপুকুর বোগারবাড়িয়া এলাকার এক সাব-ডিলার জানান, তার বস্তাপ্রতি পরিবহন খরচ হয় ২০ টাকা। তিনি ১০ টাকা লাভে সার বিক্রি করেন, কখনো কখনো কেনা দামেই বিক্রি করে দিতে হয়।
তবে যাদের সার বিক্রির কোনো লাইসেন্সই নেই, তারা আরও চড়া দামে সার বিক্রি করছে।
একই ইউনিয়নের আরেক সাব-ডিলার জানান, তার জানা মতে সরকার নির্ধারিত এক হাজার ৫০ টাকা দামে ডিএপি সার বিক্রি করলেও ডিলারদের ১০০ টাকা লাভ থাকার কথা। তা সত্ত্বেও ডিলাররা বেশি দাম রাখায় বাধ্য হয়ে তাদেরকেও চড়া দামে কিনতে হচ্ছে।
তবে ফটিক ট্রেডার্সের মালিক শহিদুল ইসলাম ফটিকের দাবি, ডিএপি ও টিএসপি সারের দাম বেশি হলেও তারা অন্যান্য সার সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ১০ টাকা কমে বিক্রি করছেন।
রানীনগর উপজেলা বিএডিসি সার ডিলার সমিতির সভাপতি রেজাউল ইসলাম জানান, তিনি সবাইকে সরকারি দামে সার বিক্রি করতে বলেছেন। কোনো ডিলার বেশি দামে বিক্রি করার কথা বললে সেটি মিথ্যা কথা। অন্যদিকে উপজেলা বিসিআইসি সার ডিলার সমিতির সভাপতি আবদুস সাত্তার শাহ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা জাহিদ কামাল জানান, বেশি দামে সার বিক্রির দায়ে ইতোমধ্যে কয়েকজন ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের অভিযানও অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার গোমনাটি ও আমবাড়ি বাজারে নন-ইউরিয়া সার বস্তাপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। নীলফামারীতে সরকার অনুমোদিত ডিলার না হয়েও সেখানে একটি বড় চক্র গড়ে উঠেছে, যারা এই জেলা ছাড়াও পাশের জেলাগুলোর সার বাজারও নিয়ন্ত্রণ করছে। এই চক্রের মধ্যে গোমনাটি বাজারের মধু ট্রেডার্স, ব্যবসায়ী রশিদুল ইসলাম ও নূর আলমসহ আরও কয়েকজন জড়িত রয়েছেন।
ডোমার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন, এদের কেউই সরকার অনুমোদিত ডিলার নন।
মধু ট্রেডার্সের পরিচালক রাজু জানান, তিনি বিভিন্ন এলাকা থেকে সার সংগ্রহ করে দিনে ২৫০ থেকে ৩০০ বস্তা বিক্রি করেন। তবে নূর আলম ও রশিদুল ইসলামের দাবি, তারা সবাই মিলে দৈনিক প্রায় চার হাজার বস্তা সার বিক্রি করে থাকেন।
ডোমারের গোমনাটি বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী নিয়মিত ট্র্যাক্টর, পিক-আপ ও অটো-রিকশায় করে হাজার হাজার বস্তা সার পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। স্থানীয় অধিবাসীদের মতে, গোমনাটি বাজারে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ ট্রাক সার খালাস করা হয়, সেখান থেকে সার বিভিন্ন উপজেলা ও জেলা শহরের বাজারে সরবরাহ করা হয়।
ডিলার না হয়েও কিভাবে তারা এত বিপুল পরিমাণ সার বিক্রি করছেন–জানতে চাইলে নীলফামারীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নাইরুজ্জামান জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রাজশাহীতে কৃষি কার্ড নিয়ে ডিলারদের কাছে গিয়ে খালি হাতে হতাশ হয়ে ফিরছেন কৃষকেরা। কোথাও বলা হচ্ছে স্টক শেষ, আবার কোথাও বরাদ্দের তুলনায় অত্যন্ত সামান্য পরিমাণ সার দেওয়া হচ্ছে। অথচ সেই একই সার খুচরা বাজারে বেশি দামে দেদারসে পাওয়া যাচ্ছে।
পবা উপজেলার নওহাটা গ্রামের কৃষক দুলাল হোসেন ডিলারের দোকান থেকে দু’বার খালি হাতে ফিরে অবশেষে খুচরা বাজার থেকে চড়া দামে সার কিনতে বাধ্য হন। দুলাল জানান, ডিলাররা দোকানে সার না রেখে গোপনে অন্য জায়গায় মজুত করে বেশি দামে বিক্রি করছেন।
বিশেষ করে টিএসপি ও ডিএপি সার কিনতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন কৃষকরা। দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক আবীর আহমেদ জানান, কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কৃষকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পবা উপজেলার নওহাটা বাজারের বিএডিসি অনুমোদিত ডিলার মেসার্স হক অ্যান্ড সন্স এন্টারপ্রাইজে গিয়ে কোনো সার পাওয়া যায়নি। এর মালিক আবদুল হক জানান, জুলাই মাসে তিনি ২২ বস্তা টিএসপি, ৭০ বস্তা এমওপি এবং ১১০ বস্তা ডিএপি বরাদ্দ পেয়েছিলেন, যা দুই-তিন দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা আগে বরাদ্দ পাওয়ার পর কালোবাজারিদের কাছে বরাদ্দপত্র বিক্রি করে দিতেন। আর এখন গুদাম থেকে তুলে দোকানে আনার আগেই খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এক জেলা বা উপজেলার জন্য বরাদ্দ করা সার অন্য জেলায় চালান করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তারা।
এসব অভিযোগ ও বেশি দামে সার বিক্রির বিষয়ে মন্তব্য জানতে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আজিজুর রহমানকে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।
দিনাজপুরের কৃষকরা জানান, সরকারিভাবে এক হাজার ৩৫০ টাকা দামের এক বস্তা ইউরিয়া তাদের কিনতে হচ্ছে এক হাজার ৬০০ টাকায়। এ ছাড়া এক হাজার ৫০ টাকার পটাশ বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় এবং এক হাজার ৫০ টাকা দামের প্রতি বস্তা ফসফেট বিক্রি হচ্ছে এক হাজার ৩৫০ টাকায়।
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলায় কৃষক জাহাঙ্গীর আলম অভিযোগ করেন, গ্রামের বাজারে ব্যবসায়ীরা প্রতি বস্তা ইউরিয়ায় ১৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত নিচ্ছেন।
তবে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. এনামুল হক দাবি করেন, বেশি দামে সার বিক্রির বিষয়ে কেউ এখনো কোনো অভিযোগ করেননি। তিনি জানান, ময়মনসিংহে সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে এবং ৩১ আগস্টের মধ্যে আবেদন আহ্বান করা হয়েছে। এই সময়ে কেউ যাতে কৃত্রিম সার সংকট তৈরি করতে না পারে, সেজন্য কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


