অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট (অজ্ঞানকারী চিকিৎসক) না থাকায় দুই মাস ধরে মেহেরপুরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বন্ধ রয়েছে অস্ত্রোপচার সেবা। তালাবদ্ধ হয়ে পড়ে আছে তিনটি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার। এতে চিকিৎসা নিতে এসে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোগীরা। বাধ্য হয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হচ্ছে তাদের। সেখানে গুনতে হচ্ছে ১৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত খরচ।
মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল এবং ৫০ শয্যার মুজিবনগর ও গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দেখা গেছে এমন চিত্র।
মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ জুন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট মেহেদি হাসান বদলি হয়ে পাশের চুয়াডাঙ্গা জেনারেল হাসপাতালে চলে যান। একই দিন এ এম রকিবুর রহমান নামের এক চিকিৎসককে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট হিসেবে পদায়ন করা হয়। তবে তিনি হাসপাতালে যোগদান না করে ঢাকায় অবস্থান করছেন।
রকিবুর রহমান জানান, তাকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে বদলির আদেশ বাতিল করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের পদটি পুরোপুরি শূন্য হয়ে পড়ে। শুধু তা-ই নয়, হাসপাতালটিতে ছয় মাস ধরে অর্থোপেডিকস, মেডিসিন, কার্ডিওলজি এবং চর্ম ও যৌন রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদও শূন্য রয়েছে। অনুমোদিত ৪২টি পদের মধ্যে ২২টি পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য।
জেনারেল হাসপাতালের অস্ত্রোপচার বিভাগ থেকে জানা গেছে, স্বাভাবিক সময়ে এখানে প্রতি মাসে গড়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন গাইনি, ৪০ থেকে ৪৫ জন সার্জারি এবং ৩৫ জনের মতো অর্থোপেডিক রোগীর অস্ত্রোপচার করা হতো। দীর্ঘদিন অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় বিশেষ করে প্রসূতি ও জটিল গাইনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এতে মাতৃমৃত্যু ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মেহেরপুর সদর উপজেলার মোনাখালী গ্রামের ষাটোর্ধ্ব রাকিবুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন। সম্প্রতি মাঠে কাজ করার সময় তার ডান পায়ে কাঁটার মতো কিছু ঢুকে যায়। পরে সেখানে ফোঁড়া হলে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। গত তিন দিন ধরে তিনি মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি আছেন।
আরেক রোগী আলেয়া বেগম বলেন, তার বাম পায়ের গোড়ালিতে ফোঁড়া হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালে ডাক্তার না থাকায় অস্ত্রোপচার হচ্ছে না। তাই তিনিও হাসপাতালে পড়ে আছেন।
একই ভোগান্তিতে পড়েছেন অন্য রোগীরাও। গাংনী উপজেলার তেতুলবাড়িয়া গ্রামের কৃষক হেলাল উদ্দিন জানান, গত ২৮ জুলাই তার স্ত্রী চম্পা খাতুনের তীব্র পেটব্যথা শুরু হলে তাকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসক জানান, অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। হেলাল উদ্দিন বলেন, হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের চিকিৎসক না থাকায় ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া হয়েছে। ওষুধ খেয়েও যন্ত্রণা কমছে না। ক্লিনিকে নিয়ে অস্ত্রোপচার করাতে ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা লাগবে, যা জোগাড় করা তার পক্ষে অসম্ভব।
অন্যদিকে, মুজিবনগর উপজেলার জয়পুর গ্রামের আম্বিয়া খাতুন ১১ দিন ধরে পেটের যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। মুজিবনগর থেকে তাকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হলেও সেখানে অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে আবারও ফিরে আসেন তিনি। জেলার বাইরে বা বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়ার আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় হাসপাতালেই কাটছে তার দিন।
স্থানীয়রা জানান, বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে কুষ্টিয়া বা চুয়াডাঙ্গা থেকে সপ্তাহে এক-দুই দিন প্রেষণে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট এনে জরুরি সিজারিয়ান বা গুরুতর অস্ত্রোপচার করা যেতো। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এমন কোনো উদ্যোগ নেই।
তবে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) জাহিদুল ইসলাম জানান, চুয়াডাঙ্গা ও কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে প্রেষণে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট আনার ব্যাপারে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, সেখানে মাত্র একজন অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট কর্মরত থাকায় তাকে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
সেবা বন্ধ থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বাস্থ্যকর্মীদেরও। মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনি বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট সুরাইয়া শারমিন জানান, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট না থাকায় বাধ্য হয়ে জরুরি রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হচ্ছে।
বিশেষ করে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন এমন রোগীদের কুষ্টিয়া ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। মেহেরপুর পৌর শহরের বাসিন্দা আজিজুল ইসলাম ও গাংনী উপজেলার বিপুল শেখ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদেরকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তাদের স্বজনেরা জানান, ৯ হাজার টাকা অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া দিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যেতে হয়েছে। অথচ মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা করা গেলে এত টাকা খরচ হতো না।
গত মঙ্গলবার সকাল ১১টার দিকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, পারিবারিক কলহের জেরে চাচাতো ভাইয়ের হাসুয়ার কোপে আহত ইমতিয়াস হোসেন নামের এক যুবককে নিয়ে হাসপাতালে ছোটাছুটি করছেন স্বজনেরা। ইমতিয়াসের বড় ভাই ফয়সাল আহমেদ বলেন, হাতে চারটি হাসুয়ার কোপ লেগেছে। মাথায় আরও দুটি কোপ রয়েছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, হাতে রগ কেটে গেছে। হাসপাতালে অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট নেই। এ কারণে দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে হবে।
হাসপাতাল এলাকায় এ সময় কয়েকজন অ্যাম্বুলেন্সচালক জড়ো হন। তাদের সঙ্গে ৭ হাজার টাকা ভাড়ায় রাজশাহী যাওয়ার চুক্তি করেন স্বজনেরা।
এদিকে, অস্ত্রোপচার সেবা বন্ধ থাকায় হাসপাতাল এলাকায় গড়ে ওঠা বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে সিজারিয়ানসহ বিভিন্ন অস্ত্রোপচারের ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
গাংনী উপজেলার তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা জামিদুল ইসলামের স্ত্রী অন্তঃসত্ত্বা। তাকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে আনা হলে অস্ত্রোপচার বন্ধ থাকায় সেখান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। হাসপাতালেই উপস্থিত ছিলেন সজিব নামের এক যুবক। দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার কথা বলে তিনি রোগীকে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান। সেখানে ১৬ হাজার টাকা খরচ করে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করা হয়।
জামিদুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পাওয়া গেলে এত টাকা খরচ হতো না। আমি দিনমজুর। ওই টাকা জোগাড় করতে একজনের কাছ থেকে কর্জ নিতে হয়েছে।’
গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা একরামুল হক এবং মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান জানান, অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট না থাকায় অপারেশন থিয়েটার চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
মেহেরপুরের সিভিল সার্জন এ কে এম আবু সাঈদ বলেন, দীর্ঘদিন অ্যানেস্থেসিওলজিস্টের পদ শূন্য থাকায় সেবাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত সংকট সমাধানের জন্য একাধিকবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। তবে অধিদপ্তর থেকে এখনো নতুন কোনো পদায়ন বা বিকল্প ব্যবস্থার নির্দেশ পাওয়া যায়নি।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। যে চিকিৎসককে ওই হাসপাতালে পদায়ন করা হয়েছিল, তিনি বিশেষ কারণে ঢাকায় বদলি হয়েছেন। আগামী সপ্তাহে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করে শূন্য পদগুলোতে চিকিৎসক পদায়নের ব্যবস্থা করার আশ্বাস দেন মোশাররফ হোসেন।


