জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে গুলি ও হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আসামির সরাসরি সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ নেই বলে দাবি করেছে আসামিপক্ষ।
রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এ যুক্তি উপস্থাপনের সময় বলেন, ঢাকার মিরপুর থেকে চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম ও ফেনী পর্যন্ত যেসব হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়েছে, কোনো ঘটনাস্থলেই আসামিদের ব্যক্তিগত উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাত আসামির পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের সময় এ দাবি করা হয়। এর আগে বুধবার প্রসিকিউশন সাত আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে তাদের যুক্তিতর্ক শেষ করে।
ওবায়দুল কাদের, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম।
তিনি বলেন, প্রসিকিউশন এই তিন নেতার বিরুদ্ধে মূলত ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’র অভিযোগ এনেছে এবং দাবি করেছে যে তারা হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
কিন্তু হাসান ইমামের যুক্তি, ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ মূলত যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো কমান্ডারের অধীনস্থদের সংঘটিত অপরাধের দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তার ভাষায়, কাদের, নাছিম ও আরাফাত কোনো কমান্ডার ছিলেন না, তারা ছিলেন রাজনীতিবিদ।
আসামিপক্ষের এই আইনজীবী বলেন, সব নির্দেশই একজনের কাছ থেকে এসেছে, তার আদেশটিই সবাই বাস্তবায়ন করেছেন। ফলে শুধু কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ভিত্তিতে কাদের, নাছিম ও আরাফাতকে দায়ী করা যায় না বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, সাক্ষ্য ও অন্যান্য প্রমাণে এসব আসামির কোনো হত্যাকাণ্ড, গোলাগুলি বা মারামারিতে সরাসরি অংশ নেওয়ার তথ্য নেই। তার দাবি, মিরপুর, রাজশাহী, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম কিংবা ফেনী কোথাও আসামিদের ব্যক্তিগত উপস্থিতির কথা সাক্ষীরা বলেননি।
হাসান ইমাম বলেন, যারা সরাসরি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন, দায় তাদেরই বহন করতে হবে।
অন্যদিকে, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল এবং ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী ইশরাত জাহান।
তিনি বলেন, ছাত্রলীগের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক পদে থাকলেই সংগঠনের মাঠপর্যায়ের প্রতিটি কর্মীর ওপর তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। তার দাবি, এমনকি ছাত্রলীগের সদস্য ফরম পূরণ করা অনেকেই জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
ইশরাত জাহান বলেন, প্রসিকিউশন পরশ, নিখিল, সাদ্দাম ও ইনানের বিরুদ্ধে নির্দেশ, উসকানি ও প্ররোচনার অভিযোগের পক্ষে অডিও-ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করলেও সেগুলো থেকে তারা ছাত্র-জনতাকে হত্যা বা আহত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন, এমন বিষয় প্রমাণিত হয়নি।
আন্দোলন দমন করার অর্থ আন্দোলনকারীদের হত্যা করা নয় বলেও যুক্তি দেন তিনি। প্রসিকিউশনের অভিযোগে থাকা ‘যারা নিজেদের রাজাকার দাবি করে, তাদের আমরা শেষ দেখে নেবো’ বক্তব্যের ব্যাখ্যায় ইশরাত জাহান বলেন, এখানে ‘শেষ করা’ বলতে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণে নেওয়াকে বোঝানো হয়েছে, আন্দোলনকারীদের হত্যা করা নয়।
নিখিলের হাতে অস্ত্র থাকার অভিযোগও অস্বীকার করেন ইশরাত জাহান। তিনি বলেন, প্রসিকিউশন জমা দেওয়া কোনো ভিডিও বা অন্য কোনো প্রমাণে নিখিলকে অস্ত্র হাতে দেখা যায়নি এবং সাক্ষীরাও এমন কথা বলেননি।
সাদ্দাম ও ইনানের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিল করার বিষয়টিও প্রসিকিউশন অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে চেয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার যুক্তি, প্রশাসনের অনুমোদন নিয়ে মিছিল করা আইনত সম্ভব এবং ওই দুই নেতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন মিছিল করেছেন।
মামলায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সাত শীর্ষ নেতাকে আসামি করা হয়েছে। তারা হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ট্রাইব্যুনাল প্রসিকিউশনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়ে সাত আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেপ্তার করতে না পারায় রাষ্ট্রীয় খরচে আসামিদের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী, আসামিদের অনুপস্থিতিতেও মামলার বিচার চলতে পারে।
২২ জানুয়ারি ট্রাইব্যুনাল সাত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে। গত ৪ আগস্ট মামলায় যুক্তিতর্ক শুরু হয়। প্রসিকিউশন বুধবার তাদের যুক্তিতর্ক শেষ করে সাত আসামির সর্বোচ্চ সাজা দাবি করে। অবশিষ্ট যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য ট্রাইব্যুনাল আগামী ১৬ আগস্ট দিন ধার্য করেছে।


