পদ্মা কেড়ে নিল স্বামী-সন্তান, বেঁচে ফিরেও নিঃস্ব জাহেরা বেগম

পদ্মা কেড়ে নিল স্বামী-সন্তান, বেঁচে ফিরেও নিঃস্ব জাহেরা বেগম
রাজশাহীর পদ্মায় নৌকাডুবির ঘটনায় স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল জাহেরা বেগম, বৃহস্পতিবার। ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

পদ্মা নদীর সঙ্গে লড়াই করে কেটেছে জাহেরা বেগমের জীবন। নদীতে চারবার ডুবেও ফিরে এসেছেন তিনি। এবারও বেঁচে ফিরছেন। কিন্তু চোখের সামনে নদীর স্রোতে হারিয়ে গেছেন স্বামী কাওসার আলী (৬০) ও একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলে জিয়ারুল ইসলাম (৩০)।

নৌকাডুবির দুই দিন পর বৃহস্পতিবার সকালে উদ্ধার হয়েছে বাবা-ছেলেকে। তাদের ফিরে পাওয়া হলো, তবে জীবিত নয়।

মঙ্গলবার দুপুরে রাজশাহী নগরের বড়কুঠি এলাকার পদ্মা নদীতে ঝড়ো বাতাসের কবলে পড়ে কাওসার আলীর শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকাটি ডুবে যায়। নদীর চর থেকে ঝাউগাছ কেটে বাড়ি ফিরছিলেন তারা। নৌকায় জাহেরা বেগমসহ আটজন ছিলেন। দুর্ঘটনার পর অন্যরা সাঁতরে কিংবা পাশের একটি নৌকার সহায়তায় তীরে উঠতে পারলেও কাওসার আলী ও তার ছেলে জিয়ারুল নদীর স্রোতে তলিয়ে যান।

ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয়দের তল্লাশির পর দুই দিন পর কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার বাংলাবাজার এলাকায় পদ্মা নদীতে কাওসার আলীর মরদেহ ভেসে ওঠে। কয়েক ঘণ্টা পর রাজশাহীর তালাইমারী এলাকায় উদ্ধার করা হয় জিয়ারুলের মরদেহ। পরে মরদেহ দুটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হলে স্থানীয় কবরস্থানে বাবা-ছেলেকে পাশাপাশি দাফন করা হয়েছে।

কাটাখালী থানার শ্যামপুর বালুঘাট এলাকার এই পরিবারের জীবন-জীবিকা ছিল পদ্মাকে ঘিরে। নদীর চর থেকে ঝাউগাছ ও খড় কেটে এনে বিক্রি করে চলত সংসার।

আরও পড়ুন

স্বামী ও সন্তানকে হারিয়ে বারবার একই কথা বলছিলেন জাহেরা বেগম, ‘এর আগেও তিনবার গাঙে ডুব্যাছি, মরতে মরতে বাঁচিছি। এবারও সাঁতার কেটে বাঁচলাম, কিন্তু নিজের চোখের সামনে স্বামী আর ব্যাটারে ডুবে যাইতে দেখলাম। খোদা আমারে না নিয়ে তাদের ক্যানে নিল?’

জিয়ারুলের স্ত্রী সায়েরা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী আর শ্বশুর দুজনে চইলা গেল। ঘরে এখন উপার্জন করার আর কেউ নাই। এই দুইটা ছোট বাচ্চা নিয়ে কীভাবে বাঁচব জানি না। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু তাকাত।’

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় ১০ বছর আগে সীমান্তঘেঁষা চর খিদিরপুরে তাদের বসতভিটা পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে যায়। সব হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিলেও জীবিকার টানে নদী ছেড়ে যেতে পারেননি তারা।

সংসার নতুন করে গুছিয়ে নিতে বছরখানেক আগে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা কিনেছিলেন কাওসার আলী। সেই নৌকায় ঝাউগাছ পরিবহন করেই সংসার চলত। প্রতি সপ্তাহে আড়াই হাজার টাকা কিস্তি পরিশোধ করতে হতো। নৌকাডুবির সঙ্গে হারিয়ে গেল পরিবারের উপার্জনের একমাত্র ভরসাও।

এখন বৃদ্ধা জাহেরা বেগম, পুত্রবধূ সায়েরা খাতুন এবং জিয়ারুলের দুই সন্তান তামিম (১১) ও তাসমিরা (৭) অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন গুনছেন। স্থানীয়দের দাবি, পরিবারটির পুনর্বাসন ও জীবিকা নিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তা প্রয়োজন।

কাটাখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সুমন কাদেরী বলেন, এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। পরিবারের কোনো আপত্তি না থাকায় মরদেহ দুটি ময়নাতদন্ত ছাড়া স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad