টেকনাফ পৌর কাউন্সিলর ও সাবেক যুবলীগ নেতা একরামুল হক হত্যাকাণ্ডের আট বছর পর তদন্তে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন তদন্তকারীরা। তারা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় ধারণ করা ১৪ মিনিটের একটি অডিও রেকর্ডিং মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ কাজ করেছে। এই রেকর্ডিং বিশ্লেষণের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডে জড়িত কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
অডিও ক্লিপটির ডিজিটাল ট্রেইল, অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যদের মধ্যে আদান-প্রদান হওয়া এসএমএস, এবং সাবেক ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি)-এর মহাপরিচালক জিয়াউল আহসানের কাছ থেকে জব্দ করা বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইস ও তথ্য বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করা হয়েছে। ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা অডিওতে থাকা কণ্ঠস্বর বিশ্লেষণ করে, তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদ এবং সাবেক র্যাব-৭ স্কোয়াড্রন লিডার নাজমুস সাকিবের বলে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করেছেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার রাত প্রায় ১০টা ৩০ মিনিটে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিফতাহ উদ্দিন আহমেদকে আটক করা হয়। তবে নাজমুস সাকিব এখনও পলাতক। তারা দুজনই একরামুল হত্যা মামলার আসামি।
২০১৮ সালের ৩১ মে কক্সবাজার প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে একরামুলের স্ত্রী আয়েশা বেগম প্রথম এই অডিওটি প্রকাশ করেন।
ডিজিটাল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, অডিওটিতে এমন একটি কণ্ঠ শোনা যায়, যা নাজমুস সাকিবের বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে তাকে ‘এটা সরাও’, ‘এখানে রাখো’, ‘ওখানে নিয়ে যাও’ ইত্যাদি নির্দেশনা দিতে শোনা যায়।
জোহা বলেন, ‘শুরুতে ধারণা করা হয়েছিল, কণ্ঠটি মেজর রুহুল আমিনের। কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণে সেটি নাজমুস সাকিবের কণ্ঠের সঙ্গে মিলে যায়। তবে মেজর রুহুল আমিনও এখনও তদন্তের আওতায় রয়েছেন।’
ওপেন-সোর্স ফরেনসিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে তদন্তকারীরা অডিওর কণ্ঠস্বরের ফ্রিকোয়েন্সি ও ওয়েভলেংথ বিশ্লেষণ করেন এবং প্রাথমিকভাবে অডিওতে থাকা কণ্ঠের সঙ্গে নাজমুস সাকিবের কণ্ঠের মিল পান। অডিওতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কথোপকথন, বারবার হুইসেলের শব্দ এবং বিভিন্ন অপারেশনাল নির্দেশনাও শোনা যায়।
জোহা আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের তিন থেকে চার দিন আগে একরামুলের ব্যবহৃত একাধিক মোবাইল নম্বর বারবার সক্রিয় হয়েছিল। পাশাপাশি অবস্থান-সংক্রান্ত তথ্যসহ অন্যান্য ডিজিটাল প্রমাণও উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ফরেনসিক বিশ্লেষণের কাজ এখনও শেষ হয়নি। সন্দেহভাজনদের কণ্ঠের নমুনা সংগ্রহের পর সিআইডি আনুষ্ঠানিক ভয়েস কম্পারিজন ও সংরক্ষণের কাজ সম্পন্ন করবে।’
প্রধান প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং আরও আটজন পলাতক আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। এ ছাড়া সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি, আনোয়ার লতিফ খান তুষার এবং মোহাম্মদ মাহবুব আলম, যারা অন্য মামলায় ইতোমধ্যে কারাগারে রয়েছেন, তাদেরও এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেন, একরামুলের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী বদি পরিকল্পিতভাবে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং পরে বিভিন্ন কৌশলে ভুক্তভোগীর সম্পত্তি দখল করেন।
মামলার অন্যান্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মাহবুব আলম, কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান, মেজর রুহুল আমিন এবং আশিকুর রহমান।
ট্রাইব্যুনাল মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ২৫ আগস্ট দিন ধার্য করেছে।
চার্জশিট অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৬ মে টেকনাফের হোটেল নেটংয়ের সামনে জমি-সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসার কথা বলে একরামুলকে ডেকে নেওয়া হয়। পরে সেদিন রাতেই মেরিন ড্রাইভ এলাকায় র্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনায় তাকে হত্যা করা হয়। সে সময় রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো দাবি করেছিল, ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা ও অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। তবে পরবর্তীতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর নিশ্চিত করে যে, একরামুলের বিরুদ্ধে কোনো মাদক-সংক্রান্ত মামলা ছিল না।
চার্জশিটে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, ভিন্নমতাবলম্বী ও সমালোচকদের বিরুদ্ধে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার একটি সুসংগঠিত অভিযান পরিচালিত হয়, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।
ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা
একরামুলের মেয়ে তার বাবাকে ফোন করার পর ১৪ মিনিটের অডিও রেকর্ডিংটি শুরু হয়েছিল। পরে দ্বিতীয় একটি কল সংযুক্ত থাকা অবস্থায় গুলির শব্দ শোনা যায়। সেই কলেই ধরা পড়ে একরামুলকে হত্যার মুহূর্ত এবং তার স্ত্রী ও মেয়েদের আর্তনাদ।
আয়েশা বেগম বলেন, ‘গত আট বছর তিনি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বদলে সার্বক্ষণিক নজরদারির মধ্যে জীবন কাটিয়েছেন। তার অভিযোগ, তাদের বাড়ির চারপাশে সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছিল, সাদা পোশাকধারীরা তাকে ও তার মেয়েদের অনুসরণ করত, আইনজীবীরা ভয়ে মামলা নিতে চাইতেন না, পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ করত না এবং র্যাব বারবার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে গুমের হুমকি দিত।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাবেক এমপি বদিসহ স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা তার আত্মীয়স্বজনকে নামমাত্র মূল্যে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করে তাদের পৈতৃক সম্পত্তি দখল করে নেয়।
আয়েশা বলেন, ‘আমাকে বলা হয়েছিল, যেকোনো সময় আমাকে হত্যা করা হতে পারে। ন্যায়বিচার চাওয়াটাই যেন অপরাধ হয়ে গিয়েছিল।’ তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলার আনুষ্ঠানিক শুনানি শুরু হওয়ায় তিনি এখন কিছুটা স্বস্তি অনুভব করছেন।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বাংলাদেশে পরিচালিত মাদকবিরোধী অভিযানে অন্তত ৪৬৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন। যদিও ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তবুও একরামুল হত্যাকাণ্ডের অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন আইনের আওতার বাইরে ছিলেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আয়েশা বলেন, ‘তিনি অবশেষে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পেয়েছেন। এ সময় অভিযুক্ত কয়েকজন র্যাব কর্মকর্তা আত্মগোপনে চলে যান। ২০২৫ সালে ট্রাইব্যুনাল মামলাটি গ্রহণ করে এবং পরে সরকার একরামুলের পরিবারকে ‘শহীদ পরিবার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
আয়েশা বেগম বলেন, ‘তিনি এখন তার স্বামীর হত্যার ন্যায়বিচার দেখতে চান এবং রাষ্ট্রের কাছ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রত্যাশা করেন।’


