পণ্য কেনার লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন নাসিমা, আর খাবারের আশায় প্রাচীরঘেঁষে বসেছিলেন ফিরোজ। নিত্যদিনের অভাব আর বেঁচে থাকার সাধারণ লড়াইটা যে তাদের জীবনের শেষ পরিণতি হয়ে উঠবে, তা কে জানত!
মঙ্গলবার বেলা দেড়টার দিকে রাজধানীর মিরপুর-২ নম্বরের লাভ রোডে মিরপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের পুরোনো সীমানাপ্রাচীরটি হঠাৎ বিকট শব্দে ধসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে ইট-কংক্রিটের নিচে চাপা পড়ে থমকে যায় দুটি প্রাণ। এ ঘটনায় ছয়জন আহত হয়েছেন। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (নিটোর) পাঁচজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ ছাড়া, একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বর্তমানে আহতরা শঙ্কামুক্ত আছেন বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান।
নিহত নাসিমা বেগম (৪৫) পেশায় ছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। পরিবার নিয়ে থাকতেন মিরপুর-২ নম্বরের জনতা হাউজিং সংলগ্ন টিনশেড ঘরে। স্বল্পমূল্যে নিত্যপণ্য কিনতে সকাল থেকে টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি। হঠাৎ ধসে পড়া দেয়ালের ভারে সব চেষ্টা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় তার। সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা জানান, আগেই মারা গেছেন তিনি।
মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাফিজুর রহমান জানান, ওই স্থানে প্রতিদিনই টিসিবির পণ্য বিক্রি হয়। তুলনামূলক কম দামে নিত্যপণ্য কিনতে সেখানে মানুষের ভিড় থাকে। এদিনও অনেক মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ কলেজের সীমানাপ্রাচীরটি লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের ওপর ধসে পড়ে। এতে কয়েকজন দেয়ালচাপা পড়েন। পরে প্রত্যক্ষদর্শীরা ভাঙা দেয়াল সরিয়ে আহতদের উদ্ধার করে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠান

অন্যদিকে ঢামেক হাসপাতালে নিয়ে আসা চেক শার্ট আর লুঙ্গি পরা অজ্ঞাত ব্যক্তিটির পরিচয় মেলে রাতে। তার নাম ফিরোজ (৪১)। নওগাঁর খাগুরকড়ি হাতিপুতা গ্রামের ফিরোজ স্ত্রী সাহিদা আক্তার ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন মিরপুর-১ নম্বরের নবাবেরবাগ এলাকায়। পেশায় রিকশাচালক ফিরোজের দিন এনে দিন খাওয়ার সংসার।
সাহিদা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানান, তিনি অন্যের বাসায় কাজ করেন। সকালে স্বামী-স্ত্রী দুজনই কাজে বের হন। ফিরোজের বিকালে বাসায় ফেরার কথা ছিল। দুপুরে বাসায় ফিরে রান্না করার সময় প্রতিবেশীদের কাছ থেকে জানতে পারেন, তার স্বামীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পরে বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজাখুঁজির পর রাতে ঢামেক হাসপাতালে গিয়ে স্বামীর মরদেহ শনাক্ত করেন।
ফিরোজের দীর্ঘদিনের পরিচিত ও সহকর্মী রিকশাচালক শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘সকালে গ্যারেজ থেকে রিকশা নিয়ে বের হওয়ার সময় আমাদের দেখা হয়েছিল। তিনি জানিয়েছিলেন, বিকাল ৩টা থেকে ৪টার মধ্যে গ্যারেজে ফিরবেন। এরপর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি।’
শরিফুল জানান, ফিরোজ খুব অসহায় ছিলেন। প্রতিদিনই তিনি মিরপুর কলেজের পেছনের সড়কে স্বেচ্ছাসেবীদের দেওয়া দুপুরের খাবার খেতেন। তার ধারণা, মঙ্গলবারও তিনি সেখানে খাবারের জন্য বসেছিলেন। তখন দেয়াল ধসে তিনি চাপা পড়েন।
মিরপুর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি এবং স্ত্রীর বক্তব্যের ভিত্তিতে ফিরোজের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।


