ঢাকায় নেমে মানুষের অসততায় বিরক্ত স্কটিস পর্যটক

ঢাকায় নেমে মানুষের অসততায় বিরক্ত স্কটিস পর্যটক
Advertisement
Advertisement

স্কটল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে এসেছেন ভ্রমণ করতে। দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশ ঘোরা হয়ে গেলেও বাংলাদেশ ছিল তার ভ্রমণতালিকার শেষ দেশ। কিন্তু ঢাকায় পা রাখার পর থেকেই একের পর এক অভিজ্ঞতা তার ভ্রমণকে করে তোলে বিস্ময়, বিরক্তি আর প্রশ্নে ভরা।

ভিসা-অন-অ্যারাইভাল নিতে দীর্ঘ প্রক্রিয়া, পরিবহন ভাড়া নিয়ে টানাটানি, রিকশা ও নৌকায় অতিরিক্ত টাকা দাবি, কেনাকাটায় ‘টুরিস্ট প্রাইস’—ঢাকার পথে পথে এমন অভিজ্ঞতার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন স্কটল্যান্ডের জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ট্রাভেলার হিউজ।

বাংলাদেশের মানুষের এই ধরনের প্রবণতা নিয়ে বিরক্ত খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যটন ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক কামরুল হাসান। টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘বিদেশি পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনা বাংলাদেশের পর্যটন খাতের জন্য নতুন নয়। শুধু পর্যটক নয়, যেকোনো বিদেশিই বিমানবন্দর থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে হয়রানির শিকার হন।’

তার মতে, এসব ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকেরা বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে উঠবেন।

অবশ্য হিউজের সবই নেতিবাচক, তা নয়। বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতা, আতিথেয়তা ও খাবারও তাকে মুগ্ধ করেছে।

দুর্ভোগের শুরু বিমানবন্দর থেকেই

ঢাকায় পৌঁছে ভিসা-অন-অ্যারাইভাল নিতে গিয়ে প্রথমেই বিড়ম্বনায় পড়েন হিউজ। ফিরতি ফ্লাইটের টিকিট ও হোটেল বুকিংয়ের তথ্য একটি ই-মেইল ঠিকানায় পাঠিয়ে তা প্রিন্ট করে দিতে বলা হয় তাকে। ৫০টিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করা হিউজের কাছে এটি মনে হয়েছে ‘সবচেয়ে কষ্টদায়ক’ ও ‘সেকেলে’ ব্যবস্থা।

বিমান থেকে নামার প্রায় দেড় ঘণ্টা পর হাতে পান ভিসা।

এরপর শুরু হয় টাকা তোলার বিড়ম্বনা। বিমানবন্দরের একাধিক এটিএম বুথে চেষ্টা করেও টাকা তুলতে পারেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত বিমানবন্দরের বাইরে মানুষের ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে টাকা তুলতে হয় তাকে। সেখানে জানতে পারেন, একবারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা তোলা যায়।

বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যাওয়ার সময় উবারে ভাড়া দেখাচ্ছিল ৫৯০ থেকে ৬০০ টাকা। কিন্তু চালকরা চাচ্ছিলেন ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা।

শেষ পর্যন্ত বেশি ভাড়ায় ট্যাক্সিতে উঠতে হয়। পথে টোলের কথা বলে তার কাছ থেকে নেওয়া হয় হয় ৫০০ টাকা। পরে হিউজ জানতে পারেন, প্রকৃত টোল ছিল ৮০ টাকা।

ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলের সামনে পৌঁছানোর পর ট্যাক্সি, পার্কিং ও টিপস আদায় করা হয় অনেকটা জোর করেই।
হিউজের ভাষায়, ‘বিদেশি পর্যটক দেখলেই যেন ভাড়া ও দামের হিসাব বদলে যায়।’

৫০ টাকার রিকশা ১০০

ঢাকার রাস্তায় রিকশায় চড়েছেন হিউজ। কোথাও ৫০ টাকা ভাড়া ঠিক করে গন্তব্যে পৌঁছানোর পর আদায় করা হয়েছে ১০০ টাকা।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে একটি টুপি কিনতে গিয়ে।

আরও পড়ুন

নিউমার্কেট এলাকায় মসজিদের পাশের এক দোকানে টুপির দাম চাওয়া হয় ৫০০ টাকা। দাম বেশি মনে হওয়ায় পাশে থাকা দুজনের কাছে জানতে চান তিনি। তারাও জানান, দাম ঠিক আছে। শেষ পর্যন্ত দরদাম করে ৩০০ টাকায় টুপিটি কেনেন হিউজ। অথচ স্থানীয় বাজারে টুপির দাম সাধারণত ৫০ থেকে ১০০ টাকা।

পোশাক পরতে সাহায্য করার পর দোকানের এক ব্যক্তি তার কাছে বকশিশ দাবি করেন। শেষ পর্যন্ত ১০০ টাকা দিতে হয়।

ভ্রমণের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে হিউজ বলেন, ‘মানুষ পর্যটক দেখে এভাবে দাম বাড়িয়ে দিলে বিষয়টি আমার একদম ভালো লাগে না। এটি এক ধরনের অসততা।’

ঢাকার নদীবন্দর সদরঘাটে গিয়েও একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন হিউজ।

নদী পার হওয়ার জন্য দরদাম করে ৪০ টাকা ভাড়ায় নৌকায় ওঠেন তিনি। কিন্তু ওপারে পৌঁছানোর পর মাঝি দাবি করেন ২০০ টাকা। পাশে থাকা এক প্রবীণ ব্যক্তিও বিষয়টি শুনে প্রতিবাদ করেন। শেষ পর্যন্ত ১০০ টাকা দিয়ে সরে যান হিউজ।

বুড়িগঙ্গার কালো ও দূষিত পানি দেখে বিস্মিত হন তিনি। নদীর পানি দিয়ে খাবারের প্লেট ধুয়ে দেওয়া হচ্ছে—এমন দৃশ্যও দেখেছেন।

লঞ্চঘাটে গিয়ে দেখেন, এক লঞ্চ আরেক লঞ্চকে ধাক্কা দিচ্ছে। লঞ্চের কেবিন, ডেকে ঘুমানোর ব্যবস্থা—সবকিছুই ঘুরে দেখেন তিনি।

আবার লঞ্চ থেকে নদীতে প্লাস্টিক ফেলার দৃশ্যও দেখেন। সেই প্লাস্টিক কুড়িয়ে নিচ্ছে প্রায় ১০ বছরের এক শিশু।

ঢাকার ‘অ্যাবসলিউট কেওস’

ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা হিউজের কাছে বিস্ময়ের।

চলন্ত বাসে মানুষের লাফিয়ে ওঠা, একে অপরকে ধাক্কা দিতে দিতে চলা বাস, রাস্তায় দুর্ঘটনা—সবকিছুই তার কাছে ‘অ্যাবসলিউট কেওস’।

সিএনজি অটোরিকশার লোহার খাঁচার ভেতরে বসে নিজেকে বন্দি ও ক্লস্ট্রোফোবিকও মনে হয়েছে তার। এই খাঁচা কেন, তার কারণ অবশ্য পরে জানতে পেরেছেন তিনি।

ঢাকায় খাবারের অভিজ্ঞতা হিউজের কাছে মিশ্র।

বেইলি রোডে গিয়ে খাওয়া কাচ্চি বিরিয়ানি তার ভালো লাগলেও বোরহানি পছন্দ হয়নি। পুরান ঢাকায় ১৮০ টাকার চিকেন টিক্কা ও পরোটা খেয়ে ভালোই লেগেছে। পেস্তা ড্রিঙ্ক পেয়েছে ১০-এ ১০। ডাবের পুডিং কিছুটা বেশি মিষ্টি মনে হয়েছে। ফুচকা খেয়ে ঝাল ও স্বাদের প্রশংসাও করেছেন তিনি।

পুরোটা প্রতারণা নয়

তবে হিউজের ঢাকার অভিজ্ঞতা শুধু প্রতারণা আর বিশৃঙ্খলার নয়।

পথে পথে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। স্থানীয় শিশুদের সঙ্গে ফুটবল খেলেছেন, ক্রিকেট খেলেছেন। কেউ কেউ তার কাছ থেকে চায়ের দাম নিতে চাননি। এক দোকানদার বিনা মূল্যে পানির বোতল দিয়ে তাকে আপ্যায়ন করেছেন।

হিউজ বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ সত্যিই দারুণ। তারা আমাকে পানি খাইয়ে আপ্যায়ন করেছে।’

বাংলাদেশের মানুষ পোশাক দেখে অন্যদেরকে বিবেচনা করে বলেও সিদ্ধান্তে এসেছেন এই পর্যটক।

হিউজ বলেন, ‘আমি যখন শর্টস ও টি-শার্ট পরেছিলাম, তখন সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। কিন্তু ঐতিহ্যবাহী পোশাক পাঞ্জাবি ও টুপি পরার পর লক্ষ্য করলাম, মানুষের সেই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকা বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর কেউ আমাকে সেভাবে পাত্তাই দিচ্ছে না।’

ব্যবস্থা নেওয়া উচিত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যটন ও হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষক কামরুল হাসানের মতে হিউজের ঘটনায় যেহেতু ভিডিও আছে, তাই জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা উচিত। পাশাপাশি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করানো উচিত। এতে যদি দেশের ভাবমূর্তি কিছুটা হলেও ঠিক করা যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়টির সেন্টার ফর ম্যোরাল ডেভেলপমেন্টের পরিচালক আবুল খায়ের মো. ইউনুস বলেন, ‘আমাদের সমাজের একটি বড় অংশই সুযোগসন্ধানী হয়ে উঠেছে। শুধু বিদেশি পর্যটক নয়, দেশের যেকোনো মানুষই নানা ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছে। সুযোগ পেলেই অন্যকে ঠকানোর এই প্রবণতা সমাজে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।’

‘সমাজের একটি বড় অংশের অসততা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করছে’, বলেন তিনি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad