নারায়ণগঞ্জে মাদক বিক্রিতে রাজি না হওয়ায় জিসান নামে এক যুবককে পরিকল্পিতভাবে ‘ছিনতাইকারী’ আখ্যা দিয়ে মব জাস্টিসের মাধ্যমে পিটিয়ে হত্যা করার অভিযোগ উঠেছে। বাড়ি থেকে ডেকে এনে সড়কের বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে জিসানের ওপর টানা তিন ঘণ্টা পাশবিক নির্যাতন চালায় উন্মত্ত জনতা। সন্তান হারিয়ে এখন শোকের মাতম বইছে পুরো পরিবারজুড়ে।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আল-ফালাহ’-এর সদস্যরা অবশ্য অভিযোগ তুলেছেন, জিসান ও অনিক নামে দুই যুবক মিলে এক ব্যক্তির মুঠোফোন ছিনতাই করেছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এরপর তাদের বাড়ি থেকে তুলে এনে নির্যাতন চালানো হয়। জিসানের শারীরিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে স্ট্যাম্পে সই রেখে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ঘটনার দিন জিসানের ওপর দুই দফায় পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। এ সময় জিসানের মা শিল্পী বেগম অনেক আকুতি-মিনতি করে প্রাণভিক্ষা চাইলেও নির্যাতনকারীদের দয়া হয়নি।
প্রথম দফায় মারধরের পর জিসানের মাকে মোবাইলের জরিমানা বাবদ ১ লাখ টাকা আনতে বলা হয়। ১০ মিনিটের মধ্যে সেই টাকা জোগাড় করতে না পারায় দ্বিতীয় দফায় পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে জিসান কোনো সাড়া না দিলে নির্যাতনকারীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং তড়িঘড়ি করে সাদা কাগজে ও স্ট্যাম্পে সই রেখে মা শিল্পীর কাছে জিসানকে হস্তান্তর করেন।
আরও পড়ুন: নারায়ণগঞ্জে ‘ছিনতাইকারী’ আখ্যা দিয়ে যুবককে পিটিয়ে হত্যা
এই ঘটনার পর জিসানের মা শিল্পী বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। তবে মামলা করার পর থেকে তা প্রত্যাহার করে নিতে স্বজনদের নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
শোকাহত মা শিল্পী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘স্থানীয় জিলানী মিয়ার ছেলে জুম্মান বেশ কিছুদিন ধরে জিসানকে মাদক বিক্রি করার জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। সেই কাজে রাজি না হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে এই ছিনতাইয়ের নাটক সাজিয়ে নির্মম নির্যাতনের পর জিসানকে হত্যা করা হয়েছে।’
কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি বলেন, ‘ছেলের পূর্বের খারাপ অভ্যাস থেকে ফেরাতে চিল্লায় পাঠিয়েছিলাম। চিল্লা থেকে ফিরে নিয়মিত নামাজ আদায় করত জিসান। বড় ভাইয়ের সঙ্গে কাঁচামালের ব্যবসায় সময় দিত। আমাকে বলেছিল বিয়ে করিয়ে দিতে, কিন্তু ছেলেটাকে ওরা বাঁচতে দিল না। কতবার প্রাণ ভিক্ষা চাইলাম, হাতে ধরলাম, পায়ে ধরলাম। ওদের দয়া হলো না।’
অন্যদিকে, যে এলাকায় মব তৈরি করে জিসানকে মারা হয়, সেখানকার বাসিন্দারা বলছেন জিসানের অত্যাচারে দীর্ঘদিন ধরেই অতিষ্ঠ ছিলেন স্থানীয়রা, তাই জনতার রোষানলে গণপিটুনিতে তার প্রাণ গেছে। তবে জিসান অপরাধী হলে তাকে আইনের হাতে তুলে না দিয়ে কেন আইন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়া হলো–এমন প্রশ্নের জবাবে বাসিন্দাদের কেউ সদুত্তর দিতে পারেননি।
এদিকে এই ঘটনায় ছয়জনকে এজহারনামীয় আসামি ও অজ্ঞাত ১০ থেকে ১৫ জনের নামে হত্যা মামলা রুজু হওয়ার পর অভিযুক্তরা প্রত্যেকে গা ঢাকা দিয়েছেন। স্থানীয় আল-ফালাহ স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অভিযুক্ত জুম্মান ও মাওলানা কাউসারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাউসার আল-ফালাহ জামে মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও ঘটনার পর থেকে মসজিদে নামাজ পড়াতে আসছেন না।
নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ের অতিরিক্ত পুলিশ এসপি তারেক আল মেহেদী টাইমসকে বলেন, ‘মাসদাইর এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা জিসানকে মব তৈরি করে হত্যা করা হয়েছে। এই ঘটনায় ফতুল্লা মডেল থানায় নিহতের মা শিল্পী বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। আইন হাতে তুলে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। ঘটনায় অভিযুক্তদের শনাক্ত করা হয়েছে, তবে অপরাধীরা গা ঢাকা দেওয়ায় এখনো কাউকে আটক করা যায়নি।’
মামলা প্রত্যাহার করার জন্য পরিবারকে চাপ দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশ এমন কোনো অভিযোগ পায়নি। আসামিদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান চলমান রয়েছে।’


