মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।
মঙ্গলবার দুপুরে বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় দেয়। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য হলেন- বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায় শেষে ইনুর স্ত্রী আফরোজা হক বলেন, ‘ফরমায়েশি রায় হয়েছে, নিকৃষ্ট রায় হয়েছে। এ রায় প্রত্যাখ্যান করছি।’
এর আগে গত ২২ জুন একই আদালত হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে করা মামলার রায় ৩০ জুন ঘোষণা করার দিন ধার্য করে। মামলায় তার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
এদিকে ইনুর বিরুদ্ধে আদালতের রায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করে একে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে উল্লেখ করেছে জাসদ। এক বিবৃতিতে দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়- ‘আজ আইসিটিতে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং একটি পরিকল্পিত বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ ছাড়া আর কিছুই নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে যে বিচার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বহিঃপ্রকাশ।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মহান মুক্তিযুদ্ধে হাসানুল হক ইনুর অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ ও বলিষ্ঠ। সেই কারণেই তার বিরুদ্ধে এই ধরনের রাজনৈতিক হয়রানি চালানো হচ্ছে।’
এদিকে ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মাহমুদুল হাসান মঙ্গলবার সকালে টাইমসকে জানান, ‘দুপুর দেড়টার দিকে রায় ঘোষণা করা হবে, আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে রায় ঘোষণার কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচার করা হবে।’
প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের দীর্ঘ শুনানি শেষে গত ১৪ মে আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে।
মামলায় প্রসিকিউশন দাবি করেছে, ইনুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে এবং তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত। অন্যদিকে আসামিপক্ষের বক্তব্য, অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এবং এ কারণে তারা ইনুর খালাস চেয়েছে।
প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম ও ফারুক আহাম্মদ। আসামিপক্ষে ছিলেন আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী ও সিফাত মাহমুদ।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উসকানি ও প্ররোচনা দিয়েছিলেন হাসানুল হক ইনু। প্রসিকিউশনের দাবি, ইনুর প্ররোচনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্ত নেন ও বাস্তবায়ন করেন।
একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে সংঘটিত অপরাধের জন্য ‘সুপিরিয়র কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’ বা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দায়ও তার ওপর বর্তায় বলে প্রসিকিউশন আদালতে যুক্তি উপস্থাপন করেছে।
শুনানির সময় প্রসিকিউশন আদালতে শেখ হাসিনা ও ইনুর মধ্যে টেলিফোনে কথোপকথনের একটি রেকর্ড উপস্থাপন করে, যেখানে জাসদ সভাপতি গণআন্দোলনকে জঙ্গিবাদ আখ্যা দিয়ে দমনের কথা বলেছেন।
তবে আসামিপক্ষের মতে, ওই কথোপকথনের কোথাও আন্দোলন দমনে গুলি চালানো, বোমাবর্ষণ করা বা নির্যাতনের নির্দেশ কিংবা এ ধরনের কোনো উসকানিমূলক বক্তব্য নেই। তাদের দাবি, প্রসিকিউশনের দাখিল করা নথিতেও এমন কোনো তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি, যা থেকে প্রমাণিত হয় যে ইনু আন্দোলন দমনে গুলি বা নির্যাতনের নির্দেশ দিয়েছেন, উসকানি দিয়েছেন কিংবা কোনো ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছেন।
মামলার তদন্ত শুরু হয় গত বছরের ২৫ মার্চ। তদন্ত সংস্থা ১১ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশনের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে। একই বছরের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ দাখিল করলে শুনানি শেষে সেদিনই ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ আমলে নেয়। পরে ২ নভেম্বর আদালত আটটি অভিযোগ গঠন করে।
গত বছরের ১ ডিসেম্বর মামলায় প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। প্রসিকিউশনের পক্ষে তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১০ জন সাক্ষ্য দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন তিনজন চাক্ষুষ সাক্ষী, দুজন বিশেষজ্ঞ সাক্ষী, একজন ভিকটিম পরিবারের সদস্য এবং জব্দ তালিকার দুজন সাক্ষী। অন্যদিকে আসামিপক্ষের পক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। গত ১৩ এপ্রিল মামলার যুক্তিতর্ক শুরু হয় এবং শুনানি শেষে ১৪ মে ট্রাইব্যুনাল রায়ের জন্য মামলাটি অপেক্ষমাণ রাখে।
২০২৪ সালের ২৬ আগস্ট হাসানুল হক ইনু গ্রেপ্তার হন। পরে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তথ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন ইনু। তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের প্রার্থী হিসেবে কুষ্টিয়ায় নিজের আসনে তিনি আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর কাছে পরাজিত হন।


