জোড়া ভূমিকম্পের পর ভেনেজুয়েলার ধ্বংসস্তূপ থেকে অন্তত দেড় হাজার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। রোববারের উদ্ধার অভিযানে ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া জীবিত কয়েকজনকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, ধ্বংসস্তূপের নিচে মাঝে মাঝে জীবিত মানুষের সন্ধান মিললেও তা বিধ্বস্ত পরিস্থিতির মধ্যে খুবই সামান্য স্বস্তি এনে দিচ্ছে। দেশটির সরকার যদিও কয়েকশ মানুষ নিখোঁজ বা আটকে থাকার কথা বলছে, কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি পরিচালিত একটি ওয়েবসাইটে রোববার প্রায় ৫০ হাজার মানুষকে এখনো নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অবশ্য শনিবার এই সংখ্যা ছিল ৫৫ হাজার।
এরইমধ্যে বিদেশি উদ্ধারকারী দলগুলো ভেনেজুয়েলায় পৌঁছেছে। তারা মূলত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত প্রদেশ লা গুয়াইরাতে প্রবেশ করে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার উত্তরের এই উপকূলীয় এলাকায় বহু ভবন ধসে পড়েছে।
অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজ স্থানীয় সময় রোববার বলেন, ‘উদ্ধার ও পুনরুদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে। রোববার আমরা জীবিত মানুষ উদ্ধার করেছি, তাই অভিযান বন্ধ করা হচ্ছে না। আমরা সবসময়ই আশা ধরে রাখি।’
তিনি জানান, ভূমিকম্পে তুলনামূলক কম ক্ষতিগ্রস্ত ভবনগুলোর বসবাসযোগ্যতা নির্ধারণে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল কমিশন গঠন করা হয়েছে।
লা গুয়াইরা প্রদেশের স্কুলগুলোতে আরও এক সপ্তাহ ক্লাস স্থগিত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এরইমধ্যে প্রায় পঁচাত্তর শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে দেশটির পার্লামেন্টের ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্টের ভাই হোর্হে রদ্রিগেজ জানান, রোববার মৃতের সংখ্যা আরও বিশজন বেড়ে এক হাজার ৪৫০ জনে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, আহতের সংখ্যা তিন হাজার ১৫০ জন, বাস্তুচ্যুত ১২ হাজার ৭২১ জন এবং ৭৭৪টি ভবন ধসে পড়েছে।
হোর্হে বলেন, ‘আমরা এখন সংকটময় সময়ের মধ্যে আছি, জীবিতদের উদ্ধার এবং যাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে তাদের জন্য আশ্রয়শিবির তৈরি করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।’
বিধ্বস্ত এলাকায় নিখোঁজদের স্বজন ও স্বেচ্ছাসেবীরা ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত ও মৃতদেহ বের করার কাজে গত কয়েক দিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করছে। তবে ভারী যন্ত্রপাতির ঘাটতি এবং সরকারি সহায়তা সীমিত থাকায় তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
এখন পর্যন্ত সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যার মধ্যে কয়েকজন শিশু রয়েছে। তবে এখনও বিপুল সংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। সবশেষ রোববার ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে এক বাবা ও তার ছেলেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস বলছে, ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭ দশমিক ২ ও ৭ দশমিক ৫ মাত্রার এই জোড়া ভূমিকম্পে এক লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হতে পারে, যা লাতিন আমেরিকার গত শতাব্দীর সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্যোগগুলোর মধ্যে একটি হতে পারে।
সুইস উদ্ধার দলের প্রধান সেবাস্তিয়ান ইউগস্টার বলেন, ‘সাধারণভাবে ভূমিকম্পের পর প্রথম ৭২ ঘণ্টা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, এর পর জীবিতদের উদ্ধার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। আমাদের ৮০ সদস্যের উদ্ধারকারী দল প্রশিক্ষিত কুকুরের সাহায্যে ধ্বংসস্তূপে একাধিক জীবিত মানুষের সন্ধান পেয়েছিল, কিন্তু ভারী ধ্বংসস্তূপের কারণে তাদের সময়মতো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।’
রোববার পর্যন্ত ভূমিকম্পের ৭২ ঘণ্টা পূর্ণ হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর শনিবার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ধারকারী দল একটি শিশুকে ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত উদ্ধার করেছে। হেলমেট পরা উদ্ধারকর্মীরা কম্বলে মোড়া কাঁদতে থাকা শিশুটিকে বের করে আনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।
একটি কলম্বিয়ান উদ্ধার দলও তিন মিটার গভীর ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা এক এগারো বছরের শিশু মোইসেসকে উদ্ধার করে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্ক্যানার ব্যবহার করে তার অবস্থান শনাক্ত করা হয়। তাকে স্ট্রেচারে করে বের করা হয়, তার একটি হাত ভেঙে গেছে এবং দিনের আলো থেকে চোখ রক্ষা করতে চোখ ঢেকে রাখা হয়। শিশুটির মা ও বোন ভূমিকম্পে মারা গেছেন।
মেক্সিকোর উদ্ধারকর্মীরা কারাবালেদা শহরের একটি ধসে পড়া ভবন থেকে আরেকজন এগারো বছরের শিশুকে উদ্ধার করেছে বলে রোববার সামাজিক মাধ্যমে জানান হোর্হে রদ্রিগেজ। ছবিতে দেখা যায়, উদ্ধারকর্মীরা একটি ছোট শরীরকে স্ট্রেচারে করে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করছে।
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আগামী এক বা দুই দিনের মধ্যে ভেনেজুয়েলার জন্য কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের নতুন সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা হতে পারে। এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন ১৫০ মিলিয়ন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছিল।
এদিকে দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা ও নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো বলেছেন, তিনি দেশে ফিরতে চান। তিনি ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন এবং ডিসেম্বর মাসে নোবেল পুরস্কার নিতে দেশ ছাড়েন।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, তার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে, কারণ তারা মনে করেন ভূমিকম্পের পর এখনো মাচাদোর দেশে ফেরার উপযুক্ত সময় নয়।


