শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ধাপে ধাপে বাড়িয়ে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ জনসংখ্যা। এই জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিনস অ্যাওয়ার্ড প্রোগ্রামে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, আমরা পর্যায়ক্রমে শিক্ষাখাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দে যাব। একবারে সেখানে যাওয়া সম্ভব নয়। তাই ধাপে ধাপে এগোচ্ছি। গত অর্থবছরে শিক্ষাখাতে প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। নতুন অর্থবছরে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ২ শতাংশের সমপরিমাণ।’
তিনি বলেন, ‘আমরা পরিকল্পনা করেছি আগামীতে এই হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নিয়ে যাব, এরপর ৪ শতাংশ এবং শেষ পর্যন্ত ৫ শতাংশে উন্নীত করব।’
শিক্ষা বাজেটে ‘শুভংকরের ফাঁকি’
ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয়ের কথা বলা হলেও বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে এ হার খুবই কম ছিল। গত কয়েক বছরে শিক্ষাখাতে প্রকৃত বরাদ্দ জিডিপির প্রায় ১ দশমিক ৩৯ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
তিনি বলেন, ‘গতবছর শিক্ষায় জিডিপির ১ দশমিক ৬৯ শতাংশ বরাদ্দ দেখানো হয়েছিল। কিন্তু এর মধ্যে শুভংকরের ফাঁকি ছিল। আইসিটি মন্ত্রণালয়, রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ শিক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কহীন বিভিন্ন খাতের ব্যয় যোগ করে এই হিসাব দেখানো হয়েছিল।’
মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব
বাংলাদেশের জনসংখ্যাকে দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে জনসংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের জন্য বড় সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তিনি বলেন, ‘মানুষই আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ। এই জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পারলে বাংলাদেশ আরও দ্রুত এগিয়ে যাবে। দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষকরাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের হাত ধরেই নতুন প্রজন্ম দক্ষতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি অর্জন করে।’
কারিগরি শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব
শুধু উচ্চশিক্ষা নয়, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার (টিভেট) সম্প্রসারণেও সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বলে জানান শিক্ষামন্ত্রী। এ খাতে চলতি অর্থবছরে ১৮ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাচ্ছেন। তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে দেশের রেমিট্যান্স আয় এবং বৈদেশিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে।
‘দুই হাত ও দুই পা নিয়ে বিদেশে যাওয়ার পরিবর্তে যদি দক্ষতা নিয়ে যেতে পারে, তাহলে তার মূল্যও বাড়বে, দেশের লাভও বাড়বে,’ বলেন তিনি।
শিক্ষা ব্যবস্থায় সংস্কারের উদ্যোগ
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থাকে পরীক্ষাকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে সৃজনশীল ও প্রকল্পভিত্তিক শিক্ষার দিকে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন কারিকুলাম ও সিলেবাস সংস্কারের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু জিপিএ-৫ কেন্দ্রিক শিক্ষা চাই না। শিক্ষার্থীরা কতটা সৃজনশীল, কতটা উদ্ভাবনী এবং সমাজের জন্য কতটা অবদান রাখতে পারবে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৭ ও ২০২৮ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে শিক্ষা কারিকুলামে আরও পরিবর্তন আনা হবে।’
জবির দ্বিতীয় ক্যাম্পাস ও আবাসন সংকট নিরসনের আশ্বাস
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ব্রাহ্ম স্কুল থেকে কলেজ এবং পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং বিভিন্ন জাতীয় সংকটে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। এটি একটি ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন ও সংকটে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ছিল দৃশ্যমান।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস ও আবাসন সংকটের প্রসঙ্গ তুলে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসর সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসন সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়টি সরকার বিবেচনায় নেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয়টি আমরা দেখব। শিক্ষার্থীদের দাবিগুলো আমাদের নজরে রয়েছে।’
শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে একাডেমিক এক্সিলেন্সের স্বীকৃতি হিসেবে এ ধরনের পুরস্কার দেওয়া হয়ে আসছে। শিক্ষার্থীদের মেধা ও অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব। এ ধরনের স্বীকৃতি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব, দায়বদ্ধতা ও সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলে।
পুরস্কারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘এই অর্জন যেন তাদের জীবনের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকে। দেশের উন্নয়ন, সমাজসেবা এবং নেতৃত্বদানে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। সময়ের সদ্ব্যবহার করতে হবে। নিজেদের দক্ষতা ও যোগ্যতা দিয়ে দেশ গঠনে ভূমিকা রাখতে হবে। আগামী বাংলাদেশের নেতৃত্ব তোমাদেরই দিতে হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. রইছ উদ্দীনের সভাপতিত্বে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ, শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল খালেক, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ সাবিনা শরমীন, শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মঞ্জুর মোর্শেদ ভুঁইয়াসহ বিভিন্ন অনুষদের ডিন, শিক্ষক, শিক্ষার্থীরা।


