বাংলাদেশে হামের প্রকোপ দিন দিন আশঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ঘরবাড়িতে আক্রান্ত শিশুদের মাধ্যমে তাদের ভাইবোন এবং খেলার সাথীদের মধ্যে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। সংকীর্ণ জায়গার কারণে আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। চিকিৎসকদের বারবার সতর্কবার্তা সত্ত্বেও সচেতনতার অভাব, আর্থিক অনটন কিংবা গাদাগাদি করে থাকার কারণে অনেক পরিবার সুস্থ শিশুদের অসুস্থদের থেকে দূরে রাখতে পারছে না।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এখন আশঙ্কা করছেন, ঘরবাড়িগুলোই এখন সংক্রমণের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামে সাতজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একজন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত ছিলেন এবং বাকি ছয়জন সন্দেহভাজন। একই সময়ে এক হাজার ৩৬৩ জন সন্দেহভাজন রোগী এবং ১৫৫ জন নতুন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত মোট সন্দেহভাজন মৃতের সংখ্যা ৩৬৯ এবং নিশ্চিতভাবে হামে মারা গেছেন ৭০ জন। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ঢাকা বিভাগ, যেখানে সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় চারজন সন্দেহভাজন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
এক শিশু থেকে অন্যটিতে সংক্রমণ
নোয়াখালীর একটি পরিবারের করুণ চিত্র এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সাক্ষ্য দিচ্ছে। আড়াই বছরের শিশু কাউসার প্রথমে অসুস্থ হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই তার ছয় বছর বয়সী বড় বোন নুসরাত জাহান ইকরার প্রচণ্ড জ্বর, শারীরিক দুর্বলতা ও শরীরে র্যাশ দেখা দেয়। ইকরাম এখন ঢাকার ডিএনসিসি হাসপাতালে জীবনের সঙ্গে লড়াই করছে।
তাদের বাবা জানান, প্রথমে কাউসারের হাম হয়েছিল। তাকে বাড়িতে আনার দুই দিন পরই ইকরার জ্বর আসে। ডাক্তার একদিন পর্যবেক্ষণে রাখতে বললেও র্যাশ ওঠার পর তিনি আর দেরি না করে সরাসরি হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
চিকিৎসা চললেও ইকরার অবস্থা এখনো স্থিতিশীল নয়। তার বাবা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে বলেন, সে কিছুই খেতে পারছে না এবং জ্বরও কমছে না। এমনকি ওষুধ খাওয়ানোও কঠিন হয়ে পড়েছে, বর্তমানে সে স্যালাইনের ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে।
টিকা না দেওয়ার কারণে পরিবারের এই বিপত্তি আরও বেড়েছে। বড় মেয়ে ইকরা অবহেলার কারণে টিকা পায়নি। পরিবারের দাবি, ২০২৪ সালে ডোজের অভাবে ছোট সন্তানদের টিকা দেওয়া সম্ভব হয়নি। এখন তাদের দুই মাস বয়সী ছোট সন্তানকে নিয়ে বাবা-মা চরম আতঙ্কে আছেন। তারা জানান, ছোট ঘরে সন্তানদের আলাদা রাখা অসম্ভব হওয়ায় তারা একে অপরের সংস্পর্শে চলে আসছে।
জনাকীর্ণ ঘরবাড়িতে ছড়াচ্ছে ভাইরাস
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হাম পৃথিবীর অন্যতম সংক্রামক রোগ। এটি আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা নিশ্বাসের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। বিশেষ করে যেসব শিশু বা গর্ভবতী নারী টিকা নেননি, তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকেন।
চিকিৎসকরা আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত আলাদা বা আইসোলেশনে রাখার পরামর্শ দিলেও বাস্তবতার সামনে তা কার্যকর হচ্ছে না। গত বুধবার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল ও ডিএনসিসি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, অনেক বাবা-মা আক্রান্ত শিশুর পাশাপাশি সুস্থ শিশুদেরও সাথে নিয়ে এসেছেন। কারণ বাড়িতে তাদের দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই।
কড়াইল বস্তির মতো এলাকায় এই সংকট আরও প্রকট, যেখানে পুরো পরিবারকে একটি মাত্র ঘরে থাকতে হয়। ডিএনসিসি হাসপাতালের পরিচালক জানান, তারা সবসময় শিশুদের আলাদা রাখার পরামর্শ দেন। কিন্তু সীমাবদ্ধতার কারণে পরিবারগুলো তা মেনে চলতে পারে না। সচেতনতা ও পারিবারিক সহযোগিতা ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
সরকারের সচেতনতা কার্যক্রম
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, দেশব্যাপী হামের টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি ব্যাপক সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হচ্ছে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রচারণার শুরু থেকেই সরকার বিভিন্ন গণমাধ্যমে জনগণকে শিক্ষিত করার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রয়েছে পোস্টার, লিফলেট বিতরণ এবং টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক ভিডিও বার্তা ও টকশো প্রচার।
বেড়েই চলেছে রোগীর সংখ্যা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ১৪ মে সকাল ৮টা পর্যন্ত দেশে ৫৪ হাজার ৪১৯ জন সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় ৭ হাজার ৩০৫ জনের শরীরে হামের নিশ্চিত উপস্থিতি পাওয়া গেছে। হাসপাতালে ভর্তির হারও বেশ উদ্বেগজনক। এই সময়ে ৩৯ হাজার ১৬০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩৪ হাজার ৯৬৮ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।
ভৌগোলিক দিক থেকে ঢাকা বিভাগে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় এখানে ৫৮৮ জন সন্দেহভাজন ও ১৩২ জন নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে। এরপরই রয়েছে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগ।
তবে এর মধ্যেই আশার কথা শুনিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। তারা জানান, হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে এগিয়ে চলছে। গত ৫ এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত ১৮ কোটি ১৪ লাখেরও বেশি মানুষকে টিকা দেওয়া হয়েছে, যা জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার ১০১ শতাংশ। বিশেষ করে গাজীপুর ও ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে টিকাদানের হার লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।


