সেই ১৯৩৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেছিল মিশর। বিশ্বমঞ্চে পা রাখা প্রথম আরব ও আফ্রিকান দেশ তারাই। কিন্তু বিশ্বকাপের একটি জয় এতদিন তাদের কাছে ছিল অধরা। অবশেষে প্রায় এক শতাব্দীর সেই দীর্ঘ আক্ষেপ ঘুচে গেল। প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়েও দ্বিতীয়ার্ধে দারুণ উজ্জীবিত ফুটবল খেলে স্মরণীয় এক জয়ের স্বাদ পেল মোহাম্মদ সালাহর দল।
বিশ্বকাপের ‘জি’ গ্রুপের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে মিশর।
ভ্যানকুভারে ম্যাচের পঞ্চদশ মিনিটে ফিন সারম্যানের গোলে নিউজিল্যান্ড এগিয়ে যায়। তবে ৫৮তম মিনিটে মোস্তাফা জিকো মিশরকে সমতায় ফেরান। এরপর ৬৭ মিনিটে দলকে এগিয়ে নেন অধিনায়ক সালাহ। আর বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার কিছুক্ষণ পর মিশরের ব্যবধান বাড়ান মাহমুদ আহমেদ ইব্রাহিম হাসান, যিনি ফুটবল বিশ্বে ‘ত্রেজেগে’ নামে পরিচিত।
এই ঐতিহাসিক জয়ের নায়ক ছিলেন মিশরীয় ফুটবলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন ও সেরা তারকা সালাহ। নিজে এক গোল করার পাশাপাশি অন্য একটি গোলেও সহায়তা করেছেন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। পুরো ম্যাচজুড়ে তাঁর পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। মাঠে তার জনপ্রিয়তাও ছিল চোখে পড়ার মতো; প্রতিবার তিনি বল স্পর্শ করা মাত্রই গ্যালারিতে থাকা দর্শকেরা করতালিতে মুখর হয়ে উঠছিলেন।
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয়ের পথে ৯২ বছর আগের এক স্মৃতিও ফিরিয়ে এনেছে মিশর। ১৯৩৪ সালে নিজেদের প্রথম ম্যাচে হাঙ্গেরির কাছে হারার ম্যাচে দুটি গোল করেছিল তারা। এরপর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে একের বেশি গোল করতে পারল ‘ফারাও’ নামে পরিচিত দলটি।
এই জয়ে দুই ম্যাচে চার পয়েন্ট নিয়ে সালাহরা এখন টেবিলের শীর্ষে উঠে গেছেন। এর আগে প্রথম ম্যাচে ইরানের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছিল নিউ জিল্যান্ড, আর বেলজিয়ামের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছিল মিশর।
ম্যাচে ফেভারিট হিসেবেই মাঠে নেমেছিল মিশর। ভ্যানকুভারের গ্যালারিতেও ছিল তাদের সমর্থকদের লাল সমুদ্র। তবে ম্যাচের ১৫ মিনিটে মিশরের রক্ষণের এক অসতর্কতার সুযোগ নিয়ে টিম পেইনের কর্নার থেকে চমৎকার হেডে নিউজিল্যান্ডকে এগিয়ে দেন রক্ষণভাগের খেলোয়াড় সারম্যান।
পিছিয়ে পড়ার পর ক্রমে ছন্দে ফিরতে থাকে মিশর। দ্বিতীয় অর্ধের শুরু থেকেই আক্রমণের গতি বাড়িয়ে দেয় তারা। ম্যাচের ৫৮তম মিনিটে আসে কাঙ্ক্ষিত সেই সমতাসূচক গোল। মোহামেদ হেনির চমৎকার ক্রস থেকে বক্সে ফাঁকায় থাকা জিকো জোরালো হেডে বল জালে জড়ান।
সমতায় ফেরার পর যেন আরও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে মিশর। দ্রুতই মেলে দ্বিতীয় গোলের দেখা। ডান প্রান্ত থেকে সালাহ দুজনকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে জিকোর সঙ্গে বল আদান-প্রদান করে চমৎকার এক নিচু শটে পরাস্ত করেন নিউজিল্যান্ডের গোলরক্ষককে। ২০১৮ বিশ্বকাপে দুটি গোল করলেও দলের জয় দেখা হয়নি সালাহর, এবার তার গোলেই জয়ের সুবাস পেতে শুরু করে দল।
ম্যাচের ৮২তম মিনিটে নিউজিল্যান্ডের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকেন ত্রেজেগে। সালাহর নিখুঁত কর্নার থেকে নিচু হয়ে দারুণ এক হেডে গোল করেন বদলি হিসেবে নামা এই খেলোয়াড়। শেষ মুহূর্তে নিউজিল্যান্ড ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করলেও মিশরের গোলরক্ষক মোস্তাফা শুবির দুর্দান্ত দক্ষতায় তা রুখে দেন।
রেফারির শেষ বাঁশির সঙ্গে সঙ্গেই ইতিহাস গড়ার উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো মিশর শিবির। এই জয়ের ফলে মিশরের পরের পর্বে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশ উজ্জ্বল হলো, যেখানে তাদের পরবর্তী প্রতিপক্ষ ইরান। আর হেরে গেলেও সুযোগ টিকে রয়েছে নিউ জিল্যান্ডের, শেষ ম্যাচে তাদের লড়তে হবে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে।


