জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান বিএনপি সরকারের ১০০ দিনের কার্যক্রম ও অগ্রগতি তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
সোমবার বিকালে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সরকারের এই ১০০ দিনের মানবিক, জনমুখী ও উন্নয়নমুখী পদক্ষেপের খতিয়ান তুলে ধরেন।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বক্তব্য দেন এবং উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এস এ এম মাহফুজুর রহমানসহ উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু, সুজাউদ্দৌলা সুজন ও শাহদাৎ হোসেন স্বাধীন উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক গতিশীলতা
গুম-খুন, হামলা-মামলা ও দমন-পীড়নের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে জনগণের ভোটে নির্বাচিত বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভা গত ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মোট ১০টি কেবিনেট সভা সম্পন্ন করেছে।
এসব সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, যার মধ্যে ৩৭টি সিদ্ধান্ত অর্থাৎ প্রায় ৬২ শতাংশ ইতোমধ্যে সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে এবং বাকি ২৩টি সিদ্ধান্ত বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, এত অল্প সময়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের এই সক্ষমতা সরকারের দ্রুততা, কার্যকারিতা ও আন্তরিকতার বড় প্রমাণ।
অপপ্রচার ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অপচেষ্টা
সরকার মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় উদার ও সহিষ্ণুতার নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, একটি গোষ্ঠী এই স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নৈরাজ্য সৃষ্টি ও অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, অশোভন আচরণ ও অশালীন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা চলছে, যোগ করেন তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, এই বিদ্বেষ ও বিষোদগারের রাজনীতিকে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলার জন্য ক্ষতিকর বলে তিনি অভিহিত করেন।
তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার দেশে মতপ্রকাশ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছিল এবং বর্তমান সরকারও সাংবাদিকদের জন্য সর্বোচ্চ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কাজ করছে।
মেগা প্রকল্প ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন
মাহদী আমিন আরও জানান, দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন গতি আনতে সরকার বড় ধরনের অবকাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এর অংশ হিসেবে আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনালের কাজ অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
একই সঙ্গে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সচল করতে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত একটি নতুন ইকোনমিক করিডোর বাস্তবায়নের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছে, যোগ করেন তিনি।
আইনের শাসন ও দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণ
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারের অঙ্গীকারের নজির হিসেবে উপদেষ্টা কয়েকটি চাঞ্চল্যকর মামলার অগ্রগতি তুলে ধরেন।
তিনি জানান, কুষ্টিয়ার মেহেরপুরে ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের দায়ে এক আসামিকে মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, যা দ্রুত বিচারের ক্ষেত্রে একটি বিরল নজির। এ ছাড়া এক দশক পর আলোচিত তনু হত্যা মামলার প্রথম আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং রিমান্ডের মাধ্যমে সত্য উদঘাটনের পথ সুগম হয়েছে। একইভাবে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিকে ভারতে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলছে।
পাসপোর্টে ‘ইসরায়েল ব্যতীত’
জাতীয় স্বার্থ, ইসলামী মূল্যবোধ ও জনগণের অনুভূতির প্রতি সম্মান জানিয়ে বাংলাদেশি পাসপোর্টে পুনরায় ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি পূর্ববর্তী সরকারের আমলে পাসপোর্ট থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল, যা বর্তমান সরকার আবার ফিরিয়ে এনেছে।
অর্থনৈতিক সংস্কার ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার, যা অর্জনে ব্যাংকিং ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক খাত ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দিতে এস আলম গ্রুপের ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়ে সফলভাবে ৯০ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে।
বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে ১০টি দেশের মধ্যে ৩টি দেশের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং বাকি দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, যার ফলে আন্তর্জাতিক আস্থা ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে, যোগ করেন তিনি।
রেমিট্যান্সের রেকর্ড ও অর্থনৈতিক তহবিল
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বিগত মাসে দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছে, যা সরকারের প্রতি প্রবাসীদের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতিফলন এবং এই মাসিক রেমিট্যান্সের পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
এ ছাড়া দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানাগুলো পুনরায় চালু করতে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে গতি আনতে সরকার ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল ঘোষণা করেছে, যার মাধ্যমে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, যোগ করেন তিনি।
শিক্ষা, প্রযুক্তি ও তরুণদের উন্নয়ন
এ সময় আরও জানানো হয়, তরুণ সমাজ ও শিক্ষার্থীদের উন্নয়নে সরকার বেশ কিছু আধুনিক ও কল্যাণমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি সুবিধা আরও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে দেশের প্রধান বিমানবন্দর ও ট্রেনগুলোতে হাই-স্পিড ফ্রি ওয়াই-ফাই সেবা চালু করা হয়েছে। এর পাশাপাশি তরুণদের সুপ্ত ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের উদ্দেশ্যে ঐতিহ্যবাহী ‘স্পোর্টস’ ও ‘নতুন কুঁড়ি’ কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের আধুনিকায়ন ও সুবিধা
স্বাস্থ্য খাতের আমূল পরিবর্তনে সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে, যার অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাঠপর্যায়ে হাম প্রতিরোধে দেশের প্রায় শতভাগ শিশুকে সফলভাবে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। একই সাথে কর্মজীবী নারীদের অধিকার সুরক্ষায় মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, বর্তমান সরকারের আমলে প্রশাসনিক ধারায় এক অনন্য পরিবর্তন এসেছে। এখন আর ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষকে নিজেদের সমস্যা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছুটে যেতে হয় না, বরং প্রধানমন্ত্রী নিজেই জনগণের দুয়ারে পৌঁছে যাচ্ছেন, মানুষের দুঃখ-কষ্টে পাশে দাঁড়িয়ে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন।
বর্তমান সরকারের গৃহীত এসব জনমুখী পদক্ষেপের ফলেই দেশের শিল্প-কারখানার শ্রমিকরা এবার অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ, আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে ঈদ উদযাপন করার সুযোগ পেয়েছেন, তিনি বলেন।


