দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে দেশের জ্বালানি খাত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
তিনি বলেছেন, দীর্ঘদিনের এই স্থবিরতা মাত্র পাঁচ-ছয় মাসে শতভাগ নিরসন করা সম্ভব নয়। তবে জ্বালানি সংকটের টেকসই ও বাস্তবসম্মত সমাধানে সরকার কাজ করছে।
বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদী কৌশলগত কাঠামো বাস্তবায়ন: নীতি, অংশীদারত্ব ও অগ্রাধিকার’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন।
মাহদী আমিন বলেন, সম্প্রতি একটি এফএসআরইউ (ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল) কারিগরিভাবে বিকল হওয়ায় গ্যাস সরবরাহে সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে। এ সংকট নিরসনে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিগত ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত প্রশাসনিক ও অবকাঠামোগত কাঠামোর কারণে জ্বালানি খাত বর্তমানে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখে। দীর্ঘদিনের এই স্থবির সমস্যা পাঁচ বা ছয় মাসে পুরোপুরি সমাধান করা বাস্তবিক অর্থেই সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনে সরকার কাজ করছে। মধ্যমেয়াদে জ্বালানি সংকটের টেকসই সমাধানের আশা প্রকাশ করেন তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, জেলা পর্যায়ে চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় পর্যায়ে কার্যক্রম শুরু করে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি জেলায় এটি সম্প্রসারণ করা হবে।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রাথমিক পর্যায়েই ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ চালু করা হচ্ছে। এ নিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে ইতোমধ্যে একাধিক আলোচনা ও পরামর্শ হয়েছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থাকলেও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও সমন্বয়ের জন্য সরাসরি কাজ করার কার্যকর কাঠামো এতদিন ছিল না। নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা হবে।
তিনি বলেন, সরাসরি জেলা পর্যায়ে গিয়ে স্থানীয় নিয়োগদাতা ও চাকরিপ্রার্থীদের একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্মে আনা হবে। যারা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন এবং যারা কাজ খুঁজছেন, উভয় পক্ষকে অনলাইন ও অফলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যুক্ত করা হবে। একই সঙ্গে প্রয়োজনীয় কারিগরি দক্ষতা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
এ উদ্যোগে বেসরকারি খাতকে সরাসরি যুক্ত করার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র। তার ভাষ্য, প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা ও যোগ্যতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মপ্রার্থী তৈরি করা হবে।
‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জে’ পিছিয়ে পড়া ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, সমাজের কোনো নাগরিক যেন জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের ধারা থেকে পিছিয়ে না পড়েন, সেটিই সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে জাতীয় অর্থনীতি ও সামাজিক সুরক্ষার মূলধারায় যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
সম্মেলনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো (জুলাই ২০২৬-জুন ২০৩১) এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়ন নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনা তুলে ধরেন তিনি।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকারের কথা জানান মাহদী আমিন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
তিনি জানান, শিগগিরই স্বাস্থ্য খাতে ১ লাখ নতুন পদ সৃষ্টি ও নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৮০ হাজার পদে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান তিনি।
শিক্ষাব্যবস্থায়ও সংস্কারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে মাহদী আমিন বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা ও সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে গড়ে তোলা হবে। পর্যায়ক্রমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল এবং অভিন্ন পোশাক চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
গ্রাম ও শহরের শিক্ষার সুযোগের বৈষম্য কমাতে ডিজিটাল সুবিধা সম্প্রসারণ এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
প্রান্তিক মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের অংশ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র।
তিনি বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর মাধ্যমে পরিবারের নারীদের স্বনির্ভরতা ও সামাজিকভাবে সক্ষম করে তোলার লক্ষ্য রয়েছে। পাশাপাশি ‘কৃষক কার্ড’-এর মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সেবা ও আবহাওয়ার পূর্বাভাস সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
মাহদী আমিন আরও বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রান্তিক মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
শহর ও গ্রামের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য কমাতে বৃক্ষরোপণ, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও খাল খননের মতো কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, সংসদ সদস্য মাধবী মারমাসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।


