৫ বছর পর মিয়ানমারে ভোট, বিশ্লেষকরা বলছেন ‘নাটক’

৫ বছর পর মিয়ানমারে ভোট, বিশ্লেষকরা বলছেন ‘নাটক’
মিয়ানমারে নির্বাচনি প্রচারে সেনা সমর্থিত ইউএসডিপির নেতাকর্মীরা। ছবি: এপি/ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

মিয়ানমারে সামরিক সরকারের অধীনে ভোটের প্রথম ধাপ শুরু হচ্ছে রোববার। পাঁচ বছরের মধ্যে এটি হতে যাচ্ছে প্রথম সাধারণ নির্বাচন। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি কেবল জান্তা সরকারের সাজানো নাটক।

বিবিসির খবরে বলা হয়, জনগণের ভোটে নির্বাচিত অং সান সু চির সরকারকে ২০২১ সালে উৎখাতের পর থেকে মিয়ানমারের শাসনভার নেয় সেনাবাহিনী। তাদের এই ক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে মিয়ানমার ও বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনবিরোধিতা তৈরি হয়, যা পরে গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়।

মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর দাবি, ২০২০ সালের সবশেষ সাধারণ নির্বাচনে অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বিপুল জয় পেলেও তা বড় ধরনের ভোটার নিবন্ধন অনিয়মের কারণে অবৈধ ছিল।

তবে স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা সে নির্বাচনে কোনো বড় ধরনের গড়মিল বা অনিয়ম খুঁজে পাননি।

ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের খবরে বলা হয়, সমালোচকদের মতে এই নির্বাচন ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানে ভেঙে পড়া মিয়ানমারের নাজুক গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করবে না। এমনকি সামরিক শাসনের ফলে শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধেরও অবসান ঘটাবে না। বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর প্রতিরোধে নির্বাচন পণ্ড হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকে।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর এই লড়াই বহু বিতর্কিত এলাকায়, বিশেষ করে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নির্বাচন আয়োজনকে জটিল করে তুলেছে। মিয়ানমার-বাংলাদেশ সীমান্তের বেশিরভাগ অংশই এখনো বিদ্রোহী আরাকান আর্মির দখলে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বিরোধী গোষ্ঠীগুলো বলছে, এই নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। মিয়ানমারের ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত সামরিক নেতা জেনারেল মিন অং হ্লাইং-এর হাতেই থেকে যাবে।

আরও পড়ুন

মিয়ানমারের সামরিক সরকারের প্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইং। ছবি: এপি/ইউএনবি

অন্যদিকে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এই নির্বাচনকে ‘বহু-দলীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মূলত জান্তা সরকারের শাসনকে বৈধতা দিতে এমন সাজানো নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছে।

দেশটিতে প্রায় একমাস ধরে তিন ধাপে ভোটগ্রহণ হবে। রোববার প্রথম ধাপ শেষে আগামী বছরের ১১ জানুয়ারি দ্বিতীয় ধাপ এবং ২৫ জানুয়ারি তৃতীয় ধাপের ভোট হওয়ার কথা।

মিয়ানমারের ভোটাররাও স্বপ্রণোদিত হয়ে ভোট দিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না বলে দাবি করেছে বিবিসি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘আমরা হয়তো ভোট দেব, তবে স্বেচ্ছায় নয়। আমাদের বাধ্য করা হচ্ছে। জীবনের হুমকি দিয়ে ভোটকেন্দ্রে পাঠানো হচ্ছে। আমরা যাদের চাই, তারা কেউ প্রার্থী নন।’

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মিয়ানমার বিষয়ক বিশ্লেষক রিচার্ড হর্সির মতে, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পেছনে যারা ছিল, সেই একই সামরিক বাহিনী এবারের নির্বাচন পরিচালনা করছে।

তিনি এপিকে বলেন, ‘এই নির্বাচন মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। এতে আগের কোনো নির্বাচনে জনগণের ভোটে বিজয়ী হওয়া রাজনৈতিক দল কিংবা প্রার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।’

হর্সি তার বিশ্লেষণে বলেন, মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মূল কৌশল- তাদের পছন্দের দল ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে বিপুল ভোটে জয়ী করা। যেন তারা সরাসরি সামরিক শাসন থেকে সরে এসে একটি ‘বেসামরিক তকমাধারী’ কিন্তু সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার গঠন করতে পারে।

জান্তা সরকার এ পরিকল্পনায় সফল হলে, তারা দাবি করতে পারবে- নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে তারা ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির’ দিকে এগিয়ে গেছে।

২০২০ সালে মিয়ানমারের সাধারণ নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন এক নারী। ছবি: এপি/ইউএনবি

সম্প্রতি দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর ১১ সদস্যের জোট আসিয়ান মিয়ানমারে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচনের আহ্বান জানায়। সে প্রস্তাবে ‘সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মধ্যে গঠনমূলক সংলাপের’ আহ্বান জানিয়ে জনগণের স্বার্থে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খোঁজার পরামর্শ দেওয়া হয়। এর পরপরই তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে জান্তা সরকার।

বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ‘সাজানো নির্বাচন’ চীন, ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের আগ্রাসনের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য অজুহাত তৈরি করবে। জান্তা সরকার তাদের প্রতি প্রতিবেশীদের সমর্থন অব্যাহত রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

কারণ, গৃহযুদ্ধে জর্জরিত দেশটি থেকে নির্যাতিত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীসহ অনেকেই বিতাড়িত হয়ে এসব দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। শরণার্থীদের থেকে মিয়ানমারের অস্থিতিশীল অবস্থার চাক্ষুষ প্রমাণ পেয়ে প্রতিবেশী দেশগুলো জান্তা সরকারের ওপর বেশ অসন্তুষ্ট।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad