১৯৯৬ সালে কিউবা ও ফ্লোরিডার মধ্যবর্তী আকাশে দুটি বেসামরিক বিমান ভূপাতিত করে চারজনকে হত্যার ঘটনায় কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে হত্যা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগে মামলা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ তিন দশক পর আনা এ অভিযোগকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন-হাভানা সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ স্থানীয় সময় বুধবার জানায়, ৯৪ বছর বয়সী রাউল কাস্ত্রোসহ মোট ছয়জনের বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিক হত্যার ষড়যন্ত্র, বিমান ধ্বংস এবং চারটি পৃথক হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে। বিমান ভূপাতিত হয়ে নিহতদের মধ্যে তিনজনই মার্কিন নাগরিক ছিলেন।
নিহতরা হলেন- আরমান্দো আলেহান্দ্রে জুনিয়র, কার্লোস আলবার্তো কস্তা, মারিও ম্যানুয়েল দে লা পেনা ও পাবলো মোরালেস।
ভূপাতিত হওয়া বিমান দুটি পরিচালনা করত কিউবান-আমেরিকান সংগঠন ব্রাদার্স টু দ্য রেসকিউ। ঘটনার সময় রাউল কাস্ত্রো ছিলেন কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। বিমান ভূপাতিতের ঘটনায় সে সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে কিউবা।
মায়ামির ফ্রিডম টাওয়ারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের ভারপ্রাপ্ত অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেদের নাগরিকদের কখনো ভুলে যায় না, ভবিষ্যতেও যাবে না।”
মার্কিন আইনে এসব অভিযোগের কয়েকটির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ ঘোষণার অনুষ্ঠানে উপস্থিত কিউবান নির্বাসিত সম্প্রদায়ের সদস্যরাও এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত কিউবান নাগরিক ইসেলা ফিতেরে বলেন, ‘৬৭ বছরের শাসনের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ অনেক আগেই আসা উচিত ছিল। রাউল কাস্ত্রো শুধু চারজনকে নয়, বছরের পর বছর অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছেন।’
তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে হাভানা। কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-কানেল এসব অভিযোগকে ‘আইনি ভিত্তিহীন রাজনৈতিক কৌশল’ বলে অভিহিত করেছেন। তার দাবি, কিউবা কেবল নিজের সীমার মধ্যে ‘বৈধ আত্মরক্ষার’ অধিকার প্রয়োগ করেছিল।
একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র কিউবার বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসনের যৌক্তিকতা তৈরির চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কিউবার ওপর চাপ বাড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন নতুন কৌশল নিচ্ছে। আমেরিকান ইউনিভার্সিটির লাতিন আমেরিকা বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম লিওগ্রান্ড বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে এমন চাপ তৈরি করতে চাইছে যাতে কিউবা আলোচনার টেবিলে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।’
ভেনেজুয়েলার সঙ্গে শক্তিশালী কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষোভের মুখে পড়েছে কিউবা। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, তেল অবরোধ ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে বিদ্যুৎ সংকট ও খাদ্যসংকট তীব্র হয়েছে।
উল্লেখ্য, রাউল কাস্ত্রো প্রায় ১৫ বছর কার্যত কিউবার শীর্ষ নেতা ছিলেন। তিনি বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর ছোট ভাই। ১৯৫৯ সালের কিউবান বিপ্লবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর দীর্ঘদিন তিনি দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন এবং কিউবার সামরিক বাহিনীর ওপর শক্ত নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলেন।
২০০৬ সালে তিনি অসুস্থ ফিদেল কাস্ত্রোর স্থলাভিষিক্ত হয়ে কিউবার অন্তর্বর্তী নেতা হন এবং ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিউবার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপরও তিনি ২০২১ সাল পর্যন্ত কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান ছিলেন, যা দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর পদ।


