প্রতিটি বাজেটই কারও জন্য স্বস্তি, আবার কারও জন্য অস্বস্তি নিয়ে আসে। প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও এর ব্যতিক্রম নয়।
বৃহস্পতিবার সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তবে এর আগেই টাইম অব বাংলাদেশের হাতে আসা বাজেট বক্তৃতা, অর্থবিল ও বাজেট সারসংক্ষেপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকার বড় ধরনের কোনো কর বাড়ায়নি। এর বদলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বেছে বেছে করছাড়, প্রণোদনা ও স্বস্তি দিয়েছে। এতে কিছু খাত সরাসরি লাভবান হলেও অন্য খাতগুলোর ওপর বাড়তি চাপের বোঝা তৈরি হচ্ছে।
সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা খাতগুলো। উদ্ভাবন, ডিজিটাল সেবা ও নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে স্টার্ট-আপ, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের কর সহায়তা অব্যাহত রাখা হচ্ছে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ বাড়াতে কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প ও বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) খাতে। আমদানি নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় কৃষিভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে দীর্ঘমেয়াদি কর সুবিধা পাচ্ছে দেশি বীজ থেকে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বড় ছাড় দেওয়া হয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল কলেজকে। এদের করপোরেট করের হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই খাত কর কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিল।
মধ্যবিত্তের প্রাপ্তি অবশ্য সীমিত। করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে উৎসে কর কমছে। নতুন করদাতাদের জন্য ন্যূনতম কর ৩ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১ হাজার টাকা করা হচ্ছে। সুবিধা পাবে আনুষ্ঠানিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোও। করপোরেট করের হার বাড়ানো হয়নি। কর ব্যবস্থাকে আরও পূর্বাভাসযোগ্য করতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো কম জটিলতায় পড়বে।
তবে ধূসর বা অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যবসার জন্য পরিস্থিতি কঠিন হতে যাচ্ছে। নতুন অর্থবিলে ব্যাংক হিসাব, ঋণ, ট্রেড লাইসেন্স, ইউটিলিটি সংযোগ ও বাণিজ্যিক গাড়ির নিবন্ধনের মতো কাজের সঙ্গে কর ও ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে। যারা এতদিন কর জালের বাইরে ছিলেন, তাদের ওপর নিয়ম মেনে চলার চাপ বাড়বে।
আমদানি করা সেবার ব্যবহারকারীদের খরচ বাড়বে। বিদেশি সেবার ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদেশে টাকা পাঠানোর আগেই ব্যাংক ও অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা ডিলারদের এই ভ্যাট কেটে রাখতে হবে। ফলে যারা বিদেশি সফটওয়্যার, ক্লাউড সেবা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, পরামর্শ বা কারিগরি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, তাদের পরিচালন ব্যয় বাড়বে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের ওপর এর মিশ্র প্রভাব পড়বে। অনানুষ্ঠানিক ব্যবসাগুলো করের আওতায় এলে নিয়ম মেনে চলা আনুষ্ঠানিক এসএমইগুলো সমান সুযোগ পাবে। তবে ছোট ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসাগুলোর জন্য নিবন্ধন, নথিপত্র ও হিসাব রাখার বাড়তি নিয়ম মেনে চলা কঠিন হতে পারে।
দরিদ্র পরিবারগুলোর ওপর সরাসরি করের প্রভাব কম, কারণ তাদের বেশির ভাগই আয়করের বাইরে। তাদের ভালো থাকা নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর।
বাজেটের এই পদক্ষেপগুলোর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিকল্পনা রয়েছে। ঢালাওভাবে সুবিধা না দিয়ে উদ্ভাবন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, দেশীয় উৎপাদন ও আনুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বিপরীত দিকে, সরকারের কাঠামোর বাইরে থাকা ব্যবসা ও লেনদেনের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে।
এই কৌশল শেষ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়াবে, নাকি অর্থনীতিতে কেবল ব্যয়ের নতুন পুনর্বণ্টন তৈরি করবে সেটিই হবে আগামী অর্থবছরের মূল দেখার বিষয়।


