হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু কোনোভাবেই স্বাভাবিক বা মেনে নেওয়ার মতো ঘটনা হতে পারে না বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)।
দেশে ক্রমবর্ধমান হাম সংক্রমণে শিশুদের ব্যাপক আক্রান্ত হওয়া এবং মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, ক্রমবর্ধমান হাম পরিস্থিতিতে শিশুর মৃত্যু বরং এটি জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, নীতি পরিকল্পনা ও রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির গুরুতর ব্যর্থতার প্রতিফলন।
এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানায়, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রতিদিনই নতুন করে বিপুলসংখ্যক শিশু হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং দুঃখজনকভাবে ভাবে প্রাণ হারাচ্ছে বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে।
হাম এমন একটি রোগ, যার বিরুদ্ধে বহু বছর ধরে কার্যকর, নিরাপদ ও স্বল্পব্যয়ী টিকা বিদ্যমান। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে-যথাসময়ে পর্যাপ্ত টিকা সংগ্রহ, সরবরাহ এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি কেন নিশ্চিত করা গেল না? কেন এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হলো, যেখানে প্রতিরোধযোগ্য রোগ আজ মহামারি-সদৃশ আকার ধারণ করে শিশুদের জীবন কেড়ে নিচ্ছে?
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় হাম প্রতিরোধী টিকা সংগ্রহে বিলম্ব, ঘাটতি কিংবা প্রশাসনিক জটিলতা ছিল। এটি সত্য হয়ে থাকলে বিষয়টি নিছক প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও মনে করে আসক।
তাদের মতে, প্রাণরক্ষাকারী অতি গুরুত্বপূর্ণ এই টিকা কেনা কেন আটকে ছিল, কোন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত থেমে গিয়েছিল, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের শীর্ষ পদে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিলেন কি না, কিংবা অবহেলা, অদক্ষতা বা সমন্বয়হীনতার কারণে জনস্বার্থ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কি না- তা অবশ্যই খতিয়ে দেখা জরুরি।
একই সঙ্গে আগের সরকার টিকা সংগ্রহে ব্যর্থ হলে, বর্তমান সরকার কীভাবে একই বা অনুরূপ প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যেই টিকা সংগ্রহ ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করতে সক্ষম হলো? এই পার্থক্যের কারণ কী? কোথায় ছিল বাধা, কারা ছিলেন দায়ী, এবং কেন প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বিলম্বিত হয়েছিল? এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য উত্তর নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা প্রয়োজন বলে মনে করে সংস্থাটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশের বর্তমান হাম পরিস্থিতিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং টিকার দুই ডোজে অন্তত ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত করা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, নজরদারি জোরদার, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে টিকাদান, সীমান্ত এলাকায় বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার সুস্পষ্ট পরামর্শ দিয়েছে।
আসকের মতে, আন্তর্জাতিক সংস্থার এই সতর্কতা প্রমাণ করে, পরিস্থিতি কেবল স্বাস্থ্যখাতের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা ও জননিরাপত্তার প্রশ্ন।
অবিলম্বে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল, বস্তি, পাহাড় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দেওয়া, আক্রান্ত শিশুদের বিনামূল্যে ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত,টিকা সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা দূরীকরণ, এবং অতীতের অবহেলা, গাফিলতি বা সিদ্ধান্তহীনতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে।


