হান্টাভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্ত ক্রুজ জাহাজ এমভি হন্ডিয়াস থেকে সরিয়ে নেওয়া এক ফরাসি যাত্রীর শরীরে রোগের উপসর্গ দেখা দেওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্টিয়ান লেকর্ন জানিয়েছেন, স্পেনের তেনেরিফ থেকে প্যারিসে ফেরার পথে চার্টার্ড বিমানে ওই যাত্রীর উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর জাহাজ থেকে সরিয়ে নেওয়া পাঁচ ফরাসি নাগরিককেই কঠোর আইসোলেশনে রাখা হয়েছে।
রোববার ৯০ জনের বেশি যাত্রীকে জাহাজটি থেকে নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই পাঁচজনও তাদের মধ্যে ছিলেন।
ডাচ মালিকানাধীন জাহাজটি ভোরের আগে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উপকূলে নোঙর করে। এ পর্যন্ত জাহাজটিতে ভ্রমণ করা তিন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনের শরীরে হান্টাভাইরাস শনাক্ত হয়েছিল।
প্যারিসের লে বোর্গেট বিমানবন্দরে ফরাসি যাত্রীদের বহনকারী বিমান অবতরণের পর ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) পরা কর্মকর্তাদের রানওয়েতে দেখা যায়। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
ফ্রান্সের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সেখানে তাদের ৭২ ঘণ্টা কোয়ারেন্টাইনে রেখে পূর্ণ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। এরপর ৪৫ দিনের জন্য বাড়িতে স্বেচ্ছা আইসোলেশনে পাঠানো হবে।
নিজেদের দেশে ফিরে যাচ্ছেন যাত্রীরা
অন্যদিকে তেনেরিফ থেকে মাদ্রিদে নেওয়া ১৪ স্প্যানিশ নাগরিককে রাজধানীর একটি সামরিক হাসপাতালে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে।
ব্রিটিশ নাগরিকদের ম্যানচেস্টারে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত তাদের কারও শরীরে উপসর্গ পাওয়া যায়নি। তবে ব্রিটিশ স্বাস্থ্য সুরক্ষা সংস্থা জানিয়েছে, সবাইকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
২৬ জন যাত্রী ও নাবিক বহনকারী একটি বিমান নেদারল্যান্ডসে পৌঁছেছে। তাদের মধ্যে আটজন ডাচ নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও আয়ারল্যান্ডের নাগরিকদের জন্যও রোববার বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়।
স্পেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনিকা গ্রাসিয়া জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রগামী দলে মোট ১৮ জন রয়েছেন। তাদের মধ্যে সব মার্কিন নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত একজন ব্রিটিশ নাগরিক আছেন।
স্পেনের স্বাস্থ্যসচিব বলেন, রোববারের মধ্যেই হন্ডিউসের ১৫০ যাত্রী ও নাবিকের মধ্যে ৯০ জনের বেশি নিজ নিজ দেশে ফিরে যাবেন। সোমবার অস্ট্রেলিয়াগামী একটি ফ্লাইট ছাড়ার কথা রয়েছে।
তেনেরিফে জটিল উদ্ধার অভিযান
রোববার সকালে হন্ডিউস জাহাজটি স্পেনের গ্রানাডিলা বন্দরে নোঙর করে। স্থানীয় সময় সকাল ৭টার দিকে চিকিৎসা দল জাহাজে ওঠে।
এরপর স্পেন সরকার ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে যাত্রীদের সরিয়ে নেওয়া ও দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
জাহাজের ডেকে বা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অনেক যাত্রীকে সাদা মেডিকেল মাস্ক পরে থাকতে দেখা যায়। প্রথম দফার উদ্ধার অভিযানে ছোট নৌকায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে যাত্রীদের তীরে আনা হয়। সেখানে পিপিই পরা কর্মকর্তারা তাদের গ্রহণ করেন।
তবে জাহাজটির আগমন ঘিরে বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের আঞ্চলিক প্রেসিডেন্টসহ অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এতে তেনেরিফে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।
কী এই হান্টাভাইরাস?
হান্টাভাইরাস সাধারণত ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়ায়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে, জাহাজের কিছু যাত্রী দক্ষিণ আমেরিকায় অবস্থানকালে ‘অ্যান্ডিজ স্ট্রেইন’-এ (এক বিশেষ ধরনের ভাইরাস) আক্রান্ত হয়েছেন, যা মানুষ থেকেও মানুষে ছড়াতে পারে।
এই ভাইরাসে জ্বর, তীব্র ক্লান্তি, পেশিতে ব্যথা, পেটব্যথা, বমি, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
প্রথম যাত্রীর মৃত্যু হয় ১১ এপ্রিল। দ্বিতীয় মৃত্যু ঘটে ২ মে। এছাড়া ২৪ এপ্রিল সেন্ট হেলেনা দ্বীপে জাহাজ থেকে নামা ৬৯ বছর বয়সী এক ডাচ নারী দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে দুই দিন পর মারা যান।
দুই ব্রিটিশ নাগরিক বর্তমানে নেদারল্যান্ডস ও দক্ষিণ আফ্রিকায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে।
আরেক ব্রিটিশ নাগরিককে দক্ষিণ আটলান্টিকের দুর্গম দ্বীপ ট্রিস্টান ডা কুনহায় সংক্রমণের সন্দেহে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সেখানে চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর মেডিকেল টিম প্যারাশুটে নেমেছে।
যুক্তরাজ্যে ফেরা যাত্রীদেরও ৭২ ঘণ্টা আইসোলেশন কেন্দ্রে রাখা হবে। পরে তাদের বাসস্থানের পরিস্থিতি বিবেচনায় বাড়িতে বা অন্য কোথাও আইসোলেশনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সব যাত্রী ও নাবিক নামিয়ে দেওয়ার পর হন্ডিউস নেদারল্যান্ডসের উদ্দেশে রওনা হবে। সেখানে মৃত এক যাত্রীর মরদেহ ও ব্যক্তিগত সামগ্রী জীবাণুমুক্ত করার পর সরিয়ে নেওয়া হবে।
‘বিশ্বের শেষ প্রান্ত’ কি সংক্রমণের উৎস…
হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর আর্জেন্টিনার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর উসুয়াইয়া নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ‘পৃথিবীর শেষ প্রান্ত’ নামে পরিচিত শহরটি অ্যান্টার্কটিকা ভ্রমণের প্রবেশদ্বার হিসেবে জনপ্রিয়।
১ এপ্রিল এই শহর থেকেই ৬ হাজার মাইলের বেশি পথের যাত্রা শুরু করেছিল এমভি হন্ডিউস। জাহাজটিতে ২২ দেশের ১১৪ যাত্রী ও ৬১ জন নাবিক ছিলেন।
ধারণা করা হচ্ছে, এখান থেকেই ভাইরাসটি জাহাজে ছড়ায়। তবে সংক্রমণের প্রকৃত উৎস বা প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি কে ছিলেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
বলা হচ্ছে, উসুয়াইয়ার উপকণ্ঠের একটি আবর্জনা ফেলার স্থানে ভ্রমণের সময় কোনো যাত্রী আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। সেখানে পাখি দেখতে পর্যটকেরা যান এবং আবর্জনার কারণে ইঁদুরের উপস্থিতিও রয়েছে।
তবে স্থানীয় কর্মকর্তারা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
তিয়েরা দেল ফুয়েগো প্রদেশের মহামারি ও পরিবেশ স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক জুয়ান ফাকুন্দো পেত্রিনা বলেন, ‘আমাদের প্রদেশে কখনো হান্টাভাইরাসের ইতিহাস নেই।’
তিনি জানান, ১৯৯৬ সালে রোগটি বাধ্যতামূলক রিপোর্টিংয়ের তালিকায় আসার পর থেকেও সেখানে একটি ঘটনাও নথিভুক্ত হয়নি।
পেত্রিনা বলেন, ‘এ অঞ্চলে রোগ বহনকারী দীর্ঘলেজযুক্ত ইঁদুরের উপপ্রজাতি নেই। উত্তর প্যাটাগোনিয়ার মতো এখানকার আবহাওয়াও নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইঁদুর ভৌগোলিক সীমারেখা মানে না ঠিকই, কিন্তু আমরা একটি দ্বীপে আছি। ম্যাগেলান প্রণালি পেরিয়ে এখানে আসা তাদের জন্য কঠিন।’
তবে আর্জেন্টিনার জাতীয় সরকার জানিয়েছে, তারা বিশেষজ্ঞ দল পাঠাবে, যারা ওই এলাকায় ভাইরাস বা দীর্ঘলেজযুক্ত ইঁদুরের উপস্থিতি পরীক্ষা করবে।


