ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার প্রধান সন্দেহভাজন ও তার কথিত সহযোগীর সঙ্গে কনস্যুলার অ্যাক্সেস বা সাক্ষাতের আবেদন জানিয়েছে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন।
সূত্র জানায়, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) শুক্রবার রাতে বেনাপোল সীমান্তসংলগ্ন বংগাঁও এলাকা থেকে ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে। ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডের পরপরই তারা ভারতে পালিয়ে যায়।
গ্রেপ্তারের পর কলকাতায় বাংলাদেশ মিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আটক দুজনের সঙ্গে কনস্যুলার সাক্ষাতের অনুমতি চায়। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত এ ধরনের আবেদন প্রক্রিয়াকরণে তিন থেকে সাত কার্যদিবস সময় লাগে এবং আশা করা হচ্ছে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হবে।
বাংলাদেশ মিশনের এক সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারের পর সন্দেহভাজনদের পশ্চিমবঙ্গের একটি আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ তাদের আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশি রিমান্ডের আবেদন করে এবং আদালত তা মঞ্জুর করে।
বিষয়টি সম্পর্কে জানেন এমন আরেক কর্মকর্তা জানান, যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া ভারতে প্রবেশের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ভারতের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ফরেনার্স অ্যাক্ট ২০২৫ অনুযায়ীও মামলা করা হয়েছে। এ আইনে দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের ছয় মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই গ্রেপ্তারের ফলে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে মামলার তদন্তে আরও আইনি সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
ভারতের আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে অবগত এক সাবেক কূটনীতিক বলেন, সন্দেহভাজনদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি প্রয়োগের কথা বিবেচনা করতে পারে। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে যেহেতু এরই মধ্যে হত্যা মামলা হয়েছে, তাই ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে নয়াদিল্লির কাছে সন্দেহভাজনদের প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানাতে পারে, যেন তাদের বিচারের মুখোমুখি করা যায়।’
ঢাকার কর্মকর্তারা খুব গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং কলকাতায় বাংলাদেশ মিশনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। কর্মকর্তাদের মতে, কনস্যুলার সাক্ষাতের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মকর্তারা সন্দেহভাজনদের পরিচয় যাচাই, গ্রেপ্তারের পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরবর্তী সমন্বয় সহজ করতে পারবেন।
এদিকে সংবাদ সংস্থা এএনআই এবং পশ্চিমবঙ্গভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘এই সময়’ রোববার জানিয়েছে যে, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং আলমগীর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে।
সূত্রের দাবি, গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকায় হওয়া ওই আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পর তারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়ে আত্মগোপনে ছিল। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ তাদের গ্রেপ্তারকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সম্প্রতি ডিজিএফআইয়ের (ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স) নবনিযুক্ত মহাপরিচালকের ভারত সফরের পরই তাদের গ্রেপ্তার করা হলো। ওই সফরে ডিজিএফআই প্রধান ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে হাদি হত্যা মামলার সঙ্গে জড়িতদেরসহ সব সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তার ও দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে জোর দেন বলে জানা গেছে।
এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই ভারতীয় কর্তৃপক্ষ শেষ পর্যন্ত দুই পলাতককে শনাক্ত করে আটক করতে সক্ষম হয়।
গত বছরের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয় নগরের বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় হাদিকে গুলি করা হয়।
প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। সেখানে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর ১৪ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের নেতা জাবের পল্টন থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন, যা পরে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর ছয়জন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয় যারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফয়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেনকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার প্রস্তুতি চলছে।


