শত্রুবেষ্টিত ইরানের দুর্গম পাহাড়। চারপাশে টহল দিচ্ছে ইরানি রেভোলিউশনারি গার্ডস (আইআরজিসি)। এর মাঝেই খড়ের গাদায় সুঁচ খোঁজার মতো এক অসম্ভব মিশন সফল করে ফিরেছে মার্কিন স্পেশাল ফোর্সেস। রুদ্ধশ্বাস ৩৬ ঘণ্টার অভিযানের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, নিখোঁজ সেই ‘কর্নেল’ এখন মুক্ত এবং নিরাপদ।
ইরানের মাটি থেকে মার্কিন সেনা কর্মকর্তাকে উদ্ধার অভিযানের বর্ণনা দিয়েছেন ফক্স টেলিভিশনের পেন্টাগন প্রতিনিধি জেনিফার গ্রিফিন। তার বর্ণনায়, হলিউডের থ্রিলার মুভির মতই এই অভিযানের প্রতিটি পরতে ছিল সিআইএ-র ধূর্ত চাল, ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সুরক্ষা এবং কমান্ডোদের দক্ষতা।
বেঁচে থাকার লড়াই
গল্পের শুরু গত শুক্রবার। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে হামলার শিকার হয় একটি মার্কিন যুদ্ধবিমান এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল। বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার মুহূর্তে প্যারাসুট নিয়ে ঝাঁপ দেন পাইলট এবং তার সঙ্গী ওয়েপনস সিস্টেম অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত এক কর্নেল।
পতনের পর শুরু হয় ওই কর্নেলের বেঁচে থাকার লড়াই। কয়েক হাজার ফুট উঁচু এক নির্জন পাহাড়ের গভীর খাঁজে আত্মগোপন করেন তিনি। টানা ৪৮ ঘণ্টা তিনি সেখানে চরম প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল অবলম্বন করেন। নিজের অবস্থান জানান দিতে ব্যবহার করেন একটি হাই-টেক ‘এনক্রিপ্টেড’ বিকন সংকেত, যা কেবল মার্কিন গোয়েন্দা রাডারই ধরতে সক্ষম।
সিআইএ’র ধোঁকায় কুপোকাত ইরান
পেন্টাগন যখন মূল উদ্ধার অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন নেপথ্যে এক চাল দেয় সিআইএ। ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাকে বিভ্রান্ত করতে তারা মিথ্যা প্রেপাগান্ডা ছড়িয়ে দেয়। প্রচার করা হয়, মার্কিন বাহিনী ইতিমধ্যে কর্নেলকে খুঁজে পেয়েছে এবং তাকে স্থলপথে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এমন খবরে বিভ্রান্ত হয়ে ভুল জায়গায় তল্লাশি চালিয়ে হন্যে হয়ে মরছিল ইরানি বাহিনী। ঠিক তখনই সিআইএ তাদের বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ওই কর্নেলের নিখুঁত অবস্থান শনাক্ত করে। হোয়াইট হাউস থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সবুজ সংকেত পাওয়ার পরপরই শুরু হয় চূড়ান্ত উদ্ধার অভিযান।
কমান্ডো অ্যাকশন ও ইসরায়েলি ঢাল
শতাধিক এলিট স্পেশাল অপারেশন ফোর্সেস এবং একাধিক যুদ্ধবিমানের এক বিশাল বহর ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করে। ফক্স নিউজের সাংবাদিক জেনিফার গ্রিফিন জানান, অভিযানের সময় ইরানি বাহিনীর সাথে সরাসরি সম্মুখযুদ্ধ এড়ানো হয়। তবে শত্রুকে দূরে সরিয়ে রাখতে মার্কিন সেনারা মুহুর্মুহু গুলিবর্ষণ করে এলাকাটি অবরুদ্ধ করে রাখে।
অন্যদিকে এই অভিযানে পাহারাদারের ভূমিকা পালন করে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। মার্কিন উদ্ধারকারী দলকে সুরক্ষা দিতে এবং ইরানের পাল্টা বিমান হামলা প্রতিহত করতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের একটি বহর ওই অঞ্চলে আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করছিল।
একটি মার্কিন বিমান বিসর্জন
অভিযানটি শতভাগ নিখুঁত হলেও কারিগরি জটিলতা থেকে রেহাই পায়নি পেন্টাগন। উদ্ধারস্থলে একটি সি-১৩০ হারকিউলিস বিমান অবতরণের পর কাদা মাটিতে আটকে যায়। সেটি উদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে পড়লে, সামরিক গোপনীয়তা রক্ষায় এবং প্রযুক্তি যাতে শত্রুর হাতে না পড়ে, সেজন্য মার্কিন বাহিনী নিজেদের বিমানটি নিজেরাই ধ্বংস করে দেয়। পরে অতিরিক্ত বিমানে করে উদ্ধারকারী দল ও কর্নেলকে ফিরিয়ে আনা হয়।
ইরানের পাল্টাপাল্টি দাবি
এদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা ইসফাহানের দক্ষিণাঞ্চলে তল্লাশি কাজে নিয়োজিত একটি মার্কিন বিমান ভূপাতিত করেছে। তবে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিখোঁজ ক্রুকে জীবিত উদ্ধার করাই ছিল এই মিশনের মূল লক্ষ্য এবং তা শতভাগ অর্জিত হয়েছে।


